ফটিকছড়িতে সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নেওয়া সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে পুকুরচুরি হয়েছে। সরকারি নথির সঙ্গে মিল নেই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার। ফ্লোর ম্যাট ও খাদ্য বিতরণে হয়েছে নয়ছয়। বিতরণ করা ৩০টি ছাগলের ২৭টি মারা যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে— ছাগলগুলো সুস্থ ছিল কিনা? আবার বেশ কয়েকজন উপকারভোগীর অভিযোগ— নাম-ঠিকানা ঠিক থাকলেও তাঁরা মাস্টাররোলে স্বাক্ষরই করেননি!
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের মাস্টাররোল অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট এবং নগদ আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার কথা। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১০০ উপকারভোগীকে দুটি ছাগল, ৫০ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট, দুটি সিআই শিট ও চারটি কংক্রিট পিলার দেওয়ার তথ্য রয়েছে। প্রথম পর্যায়ের বিতরণের শেষ সময় ছিল গতবছরের ২২ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি।
নাম-ঠিকানা ঠিক, কিন্তু স্বাক্ষর করেননি
মাস্টাররোলে উপকারভোগীদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষর রয়েছে। এসব তথ্য ধরে ২২ থেকে ২৪ আগস্ট দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল ও পেলারখীল, নারায়ণহাটের নেপচুন এবং বাগানবাজারের রামগড় চা-বাগান এলাকায় কয়েকজন উপকারভোগীর তথ্য যাচাই করা হয়।
মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, মজিব ত্রিপুরা, সশিন্দ্র ত্রিপুরা, মাধুরী ত্রিপুরা, কাঞ্চন মালা ত্রিপুরা, নিরেন্দ্র ত্রিপুরা, সোনালক্ষ্মী ত্রিপুরা, সংগ্রাম ত্রিপুরা, শিবু কুমার ত্রিপুরা, মনিবালা ত্রিপুরা ও চাকষী ত্রিপুরা জানান, তাঁদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা সঠিক। কিন্তু তাঁরা মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করেননি।
ছাগলগুলো কি সুস্থ ও সংক্রমণমুক্ত ছিল?
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, বিতরণের আগে ছাগলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পিপিআর টিকা দেওয়ার কথা। এরপর সুস্থ ও সংক্রমণমুক্ত ছাগল উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণের বিধান রয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি করে ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণের আগে বিতরণ কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষরিত কার্যাদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই বিতরণ করা হয়েছে ছাগল।
ছাগল সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, সরবরাহসংক্রান্ত নথি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ কিংবা টিকাদানের স্বতন্ত্র রেকর্ডও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি। ফলে ছাগলগুলো বিতরণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কার কথা ঠিক— থোয়াইংনিং, নাকি মমিনের
প্রথম পর্যায়ের ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে আড়াই হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এ অর্থ বিতরণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পৃথক রসিদ, ভাউচার, ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের নথিও পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর থোয়াইংনিং মার্মা বলেন, ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তার বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ বিতরণ করা হয়নি।
তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিনের দাবি, প্রকল্পের সব উপকরণ ও অর্থ উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় ও বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফ্লোর ম্যাট—খাদ্যেও নয়ছয়
প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও যাচাই করা অধিকাংশ উপকারভোগী তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তবে তাঁরা ২৫ কেজি করে দানাদার খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০ কেজি খাদ্য দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁরা অর্ধেক পরিমাণ পেয়েছেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০০টি সিআই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার বিতরণের তথ্য রয়েছে। কিন্তু যাচাই করা উপকারভোগীদের বাড়িতে এসব উপকরণ দিয়ে গৃহনির্মাণের চিত্র পাওয়া যায়নি।
৩০ ছাগলের ২৭টিই মারা গেছে!
দ্বিতীয় পর্যায়ে যাচাই করা ১৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল মারা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জনের পাওয়া ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে।
কয়েকজন জানান, ছাগলগুলো পাওয়ার সময়ই দুর্বল ছিল এবং কেউ কেউ এক সপ্তাহের মধ্যেই ছাগল মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে মৃত ছাগলের ছবি, ভিডিও বা চিকিৎসার নথি না থাকায় মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বিতরণের সময় ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল। পরে উপকারভোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ছাগল মারা যেতে পারে।
ইউএনও বললেন জানানো হয়নি
অফিস আদেশ অনুযায়ী, ছাগল বিতরণের আগে বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করার কথা থাকলেও ফটিকছড়ির ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে বিষয়টি জানানো হয়নি।
ইউএনও বলেন, ছাগল বিতরণের বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি দুঃখজনক। সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।
দায় প্রকল্প পরিচালকের
অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ছাগল বিতরণ করা হয়েছে— এটি ঠিক।
রোগাক্রান্ত ছাগল বিতরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এর জন্য প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তাকে দায়ী করেন তিনি।
আলোকিত চট্টগ্রাম


