চট্টগ্রামে ডেঙ্গু—‘ভয়ঙ্কর’ সেপ্টেম্বরে মৃত্যুতে রেকর্ড, আক্রান্তেও

চট্টগ্রামে ‘ভয়াবহ’ হচ্ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। গত ৮ মাসের চেয়ে চলতি মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুতে হয়েছে রেকর্ড। চলতি মাসেই ডেঙ্গুর থাবায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ জন। অথচ গত ৮ মাসে প্রাণ হারিয়েছিল ৫ জন।

চলতি সেপ্টেম্বরে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩১১ জন। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯০৯ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। আক্রান্তে এগিয়ে পুরুষেরা, আর মৃত্যুতে নারীরা। এখন পর্যন্ত ১২ মৃত্যুর আটজনই নারী। এছাড়া উপজেলার চেয়ে আক্রান্ত বেশি নগরে। নগরে মৃত্যু বাড়লেও উপজেলায় কারো মৃত্যু হয়নি।

কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রজনন মৌসুম। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ায় রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ফের ডেঙ্গুর ছোবল, ২ নারীর মৃত্যু

এদিকে সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে উম্মে হানি আকতার (২২) নামে এক অন্তঃস্বত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনি বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৩ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন, চট্টগ্রাম সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ১২ জন এবং নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৫ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ২৭ জন, নারী ১১ জন ও শিশু রয়েছে ৬ জন।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত্রের সংখ্যা ৩১১ জন। আর চলতি বছর মোট ৯০৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় ৫২৩ জন, উপজেলায় ৩৮৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৪৯৪ জন পুরুষ, ২৩৭ জন নারী এবং ১৭৮ জন শিশু।

অথচ গেল আগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২০২ জন, জুলাইয়ে ১৯৮ জন এবং জুনে ৪১ জন। এই তিন মাসে প্রাণ গেছে ৩ জনের। এছাড়া মে মাসে ১৮ জন, এপ্রিলে ১৮ জন ও মার্চে আক্রান্ত হয় ১০ জন। তবে এই তিন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত কারো মৃত্যু হয়নি। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ২৫ জন ও জানুয়ারিতে ৬৯ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারি মৃত্যুশূন্য দিন পার করলেও জানুয়ারিতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

এদিকে নগরের পাশাপাশি উপজেলায়ও বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত লোহাগাড়ায়। সবচেয়ে কম সন্দ্বীপে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ১৫ উপজেলায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮৬ জন। লোহাগাড়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১৪১ জন, সাতকানিয়ায় ৪৭ জন, বাঁশখালীতে ১৫ জন, আনোয়ারায় ১৪ জন, চন্দনাইশে ১৭ জন, পটিয়ায় ১৮ জন, বোয়ালখালীতে ২৫ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫ জন, রাউজানে ১২ জন, ফটিকছড়িতে ১৩ জন, হাটহাজারীতে ১৫ জন, সীতাকুণ্ডে ২৭ জন, মিরসরাইয়ে ১২ জন, সন্দ্বীপে ৭ জন ও কর্ণফুলী উপজেলায় ৮ জন।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ৫০ মৃত্যু, লাফিয়ে বাড়ছে রোগী—অসহায় সিটি করপোরেশন

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের জেলা কীটতত্ত্ববিদ মোছা. এনতেজার ফেরদাওছ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি কারণেই এডিস মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে৷ এ কারণে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। তবে সামনের শীত মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমবে। এবার সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেশি। আবহাওয়াজনিত কারণেই মূলত এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চলতি অক্টোবরেও ডেঙ্গুর তাণ্ডব থাকবে। এরপর শীত মৌসুম আসবে। তখন ধীরে ধীরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা ও চারপাশ পরিষ্কার রাখাসহ মশা নিরোধক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া দিনের বেলায় শিশুদের ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। সচেতনতার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চলতি মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। থেমে থেম বৃষ্টির কারণেই মূলত ডেঙ্গুর মশার প্রকোপ বেড়েছে। কারণ জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গু মশা জন্মায়। সেজন্য সচেতনতা বাড়াতে আমরা লিফলেট বিতরণসহ মাইকিং শুরু করেছি। এছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কাছে চিঠি দিয়েছি এবং নিয়মিত যোগাযোগ করছি।

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্ক করার পাশাপাশি প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসায় ওষুধ ও মশারি পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সকলের সচেতনতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে ২০২১ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ২৭১ জন, ২০২২ সালে ৫ হাজার ৪৪৫ জন এবং ২০২৩ সালে ১৪ হাজার ৮৭ জন। ২০২১ সালে মারা গিয়েছিল ৫ জন, ২০২২ সালে ৪১ জন এবং ২০২৩ সালে ১০৭ জন।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm