দীর্ঘদিনের যানজট, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক আর প্রতিদিনের দুর্ঘটনার আতঙ্ক পেছনে ফেলে অবশেষে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনের কাজ শুরু হয়েছে। লোহাগাড়ার চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে মহাসড়কের প্রায় ৯০০ মিটার অংশকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়।
এদিকে কাজ শুরুর খবরে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন চালক ও যাত্রীদের মাঝে। তারা বলছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক দীর্ঘদিন ধরে যানজট, বেহাল অবস্থা ও দুর্ঘটনার কারণে ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছিল। চার লেন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
স্থানীয় কামরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয়। বিশেষ করে চুনতি-জাঙ্গালিয়া অংশে সরু রাস্তা আর তীব্র বাঁকের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। চার লেন হলে মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে।
ঢাকাগামী বাসচালক আবদুর রহিম বলেন, এই সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু রাস্তার প্রস্থ কম হওয়ায় এক গাড়িকে সাইড দিতে গিয়ে আরেক গাড়ি ঝুঁকিতে পড়ে। ঈদ বা পর্যটন মৌসুমে অবস্থা ভয়াবহ হয়ে যায়। দ্রুত কাজ শেষ হলে দুর্ঘটনা ও যানজট দুটোই কমবে।
কক্সবাজারগামী যাত্রী সিরাজুল মোস্তফা বলেন, বিশ্বমানের পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাওয়ার প্রধান সড়ক এখনও দুই লেনের। এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট। আমরা চাই পুরো চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা হোক।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু হানিফ বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অংশ প্রশস্তকরণের কাজ বর্তমানে তিনটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম প্যাকেজটি সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার রাজঘাটা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার, ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ের কাজটি করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। দ্বিতীয় প্যাকেজ রাজঘাটা থেকে চুনতি মিঠার দোকান পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার, যার ব্যয় ৩৪ কোটি টাকা এবং কাজ করছে এম এ কনস্ট্রাকশন। তৃতীয় প্যাকেজ চুনতি মিঠার দোকান থেকে চুনতি জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার, যেখানে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন কাজ বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মহাসড়কের প্রস্থ মাত্র ২১ ফুট। এটি ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে। কোথাও ৬ ফুট, কোথাও ৭ ফুট পর্যন্ত রাস্তা সম্প্রসারণ করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করা হবে। পাশাপাশি চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় প্রায় ১ কিলোমিটার অংশে মাঝখানে ডিভাইডার রেখে চার লেন নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রতিদিন ভারী যানবাহন, দূরপাল্লার বাস, পর্যটকবাহী গাড়ি ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কটিতে প্রায়ই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চুনতি অংশে সরু রাস্তা, ভাঙাচোরা অংশ এবং বিপজ্জনক বাঁকের কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
তারা বলেন, শুধু আংশিক নয়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো মহাসড়ককে আন্তর্জাতিক মানের চার লেনে উন্নীত করতে হবে। এতে দেশের পর্যটন, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হবে।
এর আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গত ১৬ এপ্রিল তিনি জাতীয় সংসদে জানান, এই মহাসড়ককে আধুনিক, দ্রুতগামী ও নিরাপদ করতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে একটি বৃহৎ মেগা প্রকল্প।
তিনি বলেন, কষ্ট, ঝুঁকি আর ভোগান্তির মহাসড়ক। দীর্ঘ প্রায় ১৫৯ কিলোমিটার এই মহাসড়কটি দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক হলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। অধিকাংশ অংশ এখনো সরু ও দুই লেন সামান্য চাপেই তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। ওভারটেকিং করতে গিয়ে বাড়ছে মুখোমুখি সংঘর্ষ। বাঁক, বাজার ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, নিয়ন্ত্রণহীন গতি, প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বিশেষ করে ছুটির দিন বা পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারগামী যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, তখন এই মহাসড়ক পরিণত হয় একপ্রকার ‘ধৈর্যের পরীক্ষাগারে।
সংসদে মন্ত্রী আরও বলেন, প্রথম ধাপে ২৬.২১ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে, যা ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। তার মধ্যে ২.৬ কিলোমিটার ফ্লাইওভার, আধুনিক ডিজাইন ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুতগতির ও ভারী যানবাহনের জন্য আলাদা সুবিধা। ২০২৯ সালের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে আশাপ্রকাশ করেন মন্ত্রী।
অন্যদিকে মহাসড়কের অবশিষ্ট প্রায় ৪৮ কিলোমিটার অংশে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জাপানের উন্নয়ন সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আলোকিত চট্টগ্রাম


