বায়ুদূষণে—গড় আয়ু কমছে ৫ বছর, বিপদে চট্টগ্রাম শহরের মানুষ

চট্টগ্রামে ক্রমেই বাড়ছে বায়ু দূষণের হার। গত কয়েকবছরে বছরে দূষণ বেড়েছে প্রায় দেড়শ শতাংশ। স্বীকৃত মানের চেয়ে বাতাসে বস্তুকণা মিলছে ৪ গুণ বেশি। তাতে বসবাস অনুপযোগীর দিকে যাচ্ছে বন্দর নগরী। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আর শিল্প-কারখানার উৎপাদনে আইনের প্রতিপালন না হওয়া এবং উদাসীনতার কারণেই নাজুক হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। তাতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি জড়িত সরকারি সেবাসংস্থাগুলোও।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্রগ্রাম জেলা শহরের শব্দ ও বায়ুদূষণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর একদল গবেষক। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) বায়ু দূষণের উপর জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ভিত্তিতে জানানো হয়, এলাকাভেদে চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে নির্ধারিত মানদণ্ড থেকে প্রায় দুই থেকে আট গুণ বেশি দূষিত হচ্ছে বায়ু।

আরও পড়ুন: ‘হঠাৎ বৃষ্টিতে’ রাস্তা—অলিগলিতে হাঁটুপানি, খোলা মাঠ যেন পুকুর

বন্দর নগরী চট্রগ্রাম জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে তথ্য সংগ্রহ করে। দুই দিনব্যাপী এই কার্যক্রমে অংশ নেন ১৭ সদস্যের গবেষক দল। এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক প্রফেসর ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। গবেষক দলটি দেশব্যাপী এই  জরিপ পরিচালিত করছে।

গবেষক দলটি চট্টগ্রামের হাসপাতাল ও ক্লিনিক, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা, ১০টি আবাসিক এলাকা, ১০টি বাণিজ্যিক এলাকা, ১০টি মিশ্র এলাকা, ১০টি বিভিন্ন ধরনের কারখানা ও শিল্প এলাকা এবং ১০টি ব্যস্ততম রাস্তার সংযুক্তি পূর্ণ এলাকা ও মোড় এবং তুলনামূলক পর্যালোচনা জন্য ১০টি গ্রামীণ পরিবেশের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে।

অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা প্রতিবেদন ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’ জানাচ্ছে, বন্দরনগরীতে এখনও যে পরিমাণ বায়ুদূষণ রয়েছে, তাতে চট্টগ্রামবাসীর গড় আয়ু কমে যাচ্ছে ৪ দশমিক ৮ বছর। তবে বাংলাদেশে তীব্র বায়ুদূষণের কারণে সবমিলিয়ে সাড়ে ছয় বছরের বেশি আয়ু কমে গেছে।

আরও পড়ুন: ‘দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে’ পথে পথে কোরবানি বর্জ্য

বাতাসের বিষাক্ত কণাগুলো সহনীয় মাত্রায় থাকলে দেশের মানুষ হয়তো ৬ দশমিক ৭ বছর বেশি বাঁচতে পারতো। বর্তমানে সারা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশটির নাম বাংলাদেশ। ভারত রয়েছে এরপরেই।

এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স (একিউএলআই) বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা পূরণ হলে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু আরও প্রায় সাত বছর বেড়ে যেতো। এর আগে ১৯৯৮ সালে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু কমে গিয়েছিল ২ দশমিক ৮ বছর। গত কয়েক বছরে দেশে বায়ুদূষণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের’ তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার বায়ুতেই দূষণকারী বিষাক্তকণার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় উল্লেখিত মাত্রার চেয়ে অন্তত চারগুণ বেশি। বিশ্ব বায়ু মান প্রতিবেদন ২০২০ অনুসারে, বাংলাদেশে গড়ে বার্ষিক পিএম২.৫ গ্রহণের হার ৭৭ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার, যা ডব্লিউএউচও নির্ধারিত সহনসীমার চেয়ে প্রায় সাতগুণ বেশি।

আরও পড়ুন: বৃষ্টি আর বাতাসকে পাশ কাটিয়ে বৌদ্ধ বিহারে পুণ্যার্থীরা

এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে দূষিত বিভাগ হচ্ছে ঢাকা ও খুলনা। এ দুটি অঞ্চলে বায়ুদূষণের মাত্রা ডব্লিউএইচও নির্দেশিকার তুলনায় আটগুণ বেশি এবং এর কারণে সেখানকার বাসিন্দাদের প্রত্যাশিত আয়ু কমে যাচ্ছে প্রায় আট বছর করে। এমনকি দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকা চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের গড় আয়ুও ৪ দশমিক ৮ বছর কমিয়ে দিচ্ছে এই বায়ুদূষণ।

এসি
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm