ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহল বলছেন, এটি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইনেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
জানা গেছে, সোমবার (১ জুন) রাতে চকরিয়া থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ধর্ষণের শিকার ওই কিশোরীর একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। পোস্টটি প্রকাশের পরপরই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। পরে সমালোচনার মুখে থানার ফেসবুক পেজটি ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সম্প্রতি চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের একটি আলোচিত মামলাকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, ঈদগাঁও উপজেলার এক কিশোরীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়। কিশোরীর বাবার দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার এবং অভিযুক্ত নুরুল আমিনকে (২৪) গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তীতে পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
তবে এ ঘটনার আগেই অভিযুক্ত নুরুল আমিনকে মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় চকরিয়া থানার এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসআই আরকানকে ঘিরে সৃষ্ট সমালোচনা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতেই ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। এমনকি ওই ছবির সঙ্গে একটি দীর্ঘ ব্যাখ্যামূলক স্ট্যাটাসও যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র বলছে, উদ্ধার অভিযানের পর কিশোরীকে থানায় নেওয়া হলে ওসি মনির হোসেনের কক্ষে তার ছবি তোলা হয়। প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কিশোরীর ওড়না সরিয়ে পাশের আসবাবপত্রের ওপর রাখা হয়েছে। পরে সেই ছবিই থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।
চকরিয়া থানার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসআই আরকানকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের জবাব দিতে এবং পুলিশের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যেই ভিকটিমের ছবি ও ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে এই পদক্ষেপ উল্টো নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় এবং পুলিশের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন অনেকে। স্থানীয় সাংবাদিক ইসুফ বিন হোসেন এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেন— ১৪ বছরের কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে ছবি তুলে বিবৃতি দেওয়া কি বেশি জরুরি ছিল?
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার কোনো নারী বা শিশুর নাম, ছবি, ঠিকানা কিংবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, যার মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এ বিধান লঙ্ঘন করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বলেন, আমার মেয়েকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন বলে আমাকে জানানো হয়। কিন্তু আমার মেয়ের ছবি ফেসবুকে প্রকাশের বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। কোনো অনুমতিও নেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, আইনের রক্ষক হিসেবে একজন ওসির এমন আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পরে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভুক্তভোগীর কোনো ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা আইন পরিপন্থী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। থানার ফেসবুক পেজে ছবি প্রকাশ করা ঠিক হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলা হবে। তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোও খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ভিকটিমের পরিচয় প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সাধারণ মানুষ কিংবা প্রশাসনের কর্মকর্তা— সবার ক্ষেত্রেই আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ওসিকে অবিলম্বে অপসারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অপরদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমকেডি/আলোকিত চট্টগ্রাম

