দেশের পর্যটন, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত, শত শত দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও স্থানীয় যানবাহনের চাপে ব্যস্ত এই মহাসড়ক এখন যেন রূপ নিয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আড়ালে এখানে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ।
গত ২৩ মে দুপুরে পটিয়ায় ঘটে যাওয়া আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নতুন করে নাড়িয়ে দেয় পুরো অঞ্চলকে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া আনসার ক্যাম্প এলাকার সামনে যাত্রীবাহী দ্রুতগতির হানিফ পরিবহনের বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয় দুই কিশোর। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তাদের আরেক বন্ধু।
নিহতদের একজন পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের শেখ মোহাম্মদপাড়ার জাহেদুল আলমের ছেলে ওয়ালিদ আল তাসনিম (১৭)। অন্যজন একই এলাকার আকতার হোসেনের ছেলে শাহাদাত হোসেন সামি (১৬)। গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আবদুল আলমের ছেলে তানভিরুল ইসলাম জয়কে (১৮)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়রা ছুটে গিয়ে দেখতে পান দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে একটি মোটরসাইকেল। রক্তাক্ত অবস্থায় ছিটকে পড়ে আছে তিন কিশোর। স্থানীয় দোকানি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখি ছেলেগুলো রাস্তায় পড়ে আছে। মানুষ দৌড়ে এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসছে।
শুধু পটিয়ার এই দুর্ঘটনাই নয়, গত এক বছরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কজুড়ে যেন চলছে মৃত্যুর মিছিল। একাধিক সূত্র বলছে, গত ১১ মাসে এই মহাসড়কে অন্তত ১৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১৫০ জন। আহত হয়েছেন ৩৫১ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, মাত্র আট মাসেই নিহত হয়েছেন ৯৮ জন, আহত ২৫৬ জন।
চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় টানা কয়েকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জন নিহত হন। একই স্থানে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে একাধিক দুর্ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। ঈদের দিনেও এই মহাসড়কে ঝরে পাঁচ প্রাণ। লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় বাস ও মিনিবাস সংঘর্ষে নিহত হন পাঁচজন।
সড়ক বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও হাইওয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে দুর্ঘটনার কয়েকটি বড় কারণ। যার মধ্যে রয়েছে— দুই লেনের সরু মহাসড়ক, শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও অসম সড়ক, অতিরিক্ত গতিতে বাস চলাচল, ওভারটেকিং প্রতিযোগিতা, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার ও স্থানীয় যান চলাচল, দুর্বল ট্রাফিক তদারকি, পর্যাপ্ত স্পিড মনিটরিংয়ের অভাব এবং পথচারী পারাপারে নিরাপদ ব্যবস্থার সংকট।
একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৪৮ কিলোমিটারের এই মহাসড়কের অধিকাংশ অংশ মাত্র ১৮ থেকে ২২ ফুট প্রশস্ত। অনেক স্থানে ডিভাইডার না থাকায় সামান্য ভুলেই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দূরপাল্লার বাসগুলো অনেক সময় নির্ধারিত গতিসীমা মানে না। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী ওঠানো ও সময় বাঁচানোর প্রতিযোগিতা ভয়াবহ।
পটিয়ার বাসিন্দা ও সমাজকর্মী আশিকুল মোস্তফা তাইফু বলেন, প্রতিদিন মানুষ মরছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেই। শুধু দুর্ঘটনার পর পুলিশ আসে, লাশ যায়, তারপর আবার সব আগের মতো।
তবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা। পটিয়া হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুনুর রশিদ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া ওভারটেকিংই বেশিরভাগ দুর্ঘটনার মূল কারণ। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও আধুনিক মনিটরিং ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল আরোহীদের অনেকেই হেলমেট ব্যবহার করেন না, ট্রাফিক নিয়মও মানেন না। সচেতনতার অভাবও বড় কারণ।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ধাপে ধাপে ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু অংশে উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমান অবকাঠামো সেই চাপ সামলাতে পারছে না। দ্রুত সম্প্রসারণ ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
এদিকে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর বলছে, দুর্ঘটনা কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে— মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা, আধুনিক স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে সিগন্যাল চালু, আলাদা মোটরসাইকেল লেন, ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণ, হাইওয়ে টহল জোরদার, পথচারী পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ তৈরি এবং চালকদের মানসিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।
আলোকিত চট্টগ্রাম
