‘প্রেমিকা’ উদ্ধার অভিযান নিয়ে এখন উত্তপ্ত চকরিয়া। পাহাড়ি গ্রামে পুলিশের উদ্ধার অভিযান নিয়েও চলছে তুমুল সমালোচনা। অভিযানের সময় প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়কে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় দুজনকে ছাড়াতে পুলিশ ও পুলিশের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করেন। এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পুলিশের ব্যবহৃত একটি অটোরিকশা ভাঙচুর করে এবং পুলিশ সদস্যদের ধাওয়া দেয়।
শনিবার (৩০ মে) বিকেল ৫টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদগাঁও উপজেলার এক তরুণী প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকার নুরুল আমিনের (২৪) বাড়ি চলে আসেন। পরে উভয় পরিবারের মধ্যে তাদের বিয়ে নিয়ে আলোচনা হয়।
নুরুল আমিনের মা দাবি করেন, মেয়ের বাবা-মা শুক্রবার তাদের বাড়ি এসে বিয়ের বিষয়ে সম্মতি দেন এবং দেনমোহরও নির্ধারণ করা হয়। আলোচনার সময় মেয়ের বয়স ২০ বছর বলে জানানো হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে মেয়ের পরিবারের কয়েকজন সদস্য এ বিয়েতে আপত্তি জানান।
অন্যদিকে মেয়ের বাবা আব্দুল জলিল থানায় দায়ের করা অভিযোগে দাবি করেন, তার মেয়ের বয়স ১৪ বছর এবং তাকে ফুসলিয়ে অপহরণ করা হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার বিকেলে চকরিয়া থানা পুলিশের একটি দল তরুণীকে উদ্ধারে যায়। কিন্তু তরুণী পুলিশের সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে এসআই মো. আরকানুল ইসলামের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তরুণী উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করেন। এ সময় নুরুল আমিনকে মারধর করা হলে তাকে বাঁচাতে প্রেমিকা এগিয়ে আসেন এবং প্রেমিককে জড়িয়ে ধরেন। তবে তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। মারধরের একপর্যায়ে নুরুল আমিন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পুলিশকে ধাওয়া দেয় এবং পুলিশের ব্যবহৃত অটোরিকশা ভাঙচুর করে। পরে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেনের নেতৃত্বে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরিবারের দাবি, গুরুতর আহত অবস্থায় নুরুল আমিনকে প্রথমে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার বিষয়ে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়েকে অপহরণের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ উদ্ধার অভিযানে যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন বলে খবর পেয়ে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়ে আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের স্বার্থে এসআই মো. আরকানুল ইসলাম আকরামকে রাত ১টার দিকে চকরিয়া থানা থেকে ক্লোজ (প্রত্যাহার) করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে।
এদিকে তরুণী উদ্ধার অভিযানে মারধরের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এ ঘটনায় দোষী পুলিশদের শাস্তির পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্তও দাবি করা হয়।
কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি অ্যাডভোকেট মীর মোশারফ হোসেন টিটু ফেসবুক পোস্টে লিখেন— ভিকটিম উদ্ধারের পুলিশী ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই ঘটনার সাথে আর কারা কারা জড়িত তার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অভিজিৎ দাশ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীকে উদ্ধার করতে গেলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের একটি যানবাহন ভাঙচুর হয়েছে এবং দুই পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, উদ্ধার অভিযানে কোনো পুলিশ সদস্যের গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
আলোকিত চট্টগ্রামে


