চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতির অবনতি, আইসিইউ-অক্সিজেন সঙ্কট, হাসপাতালের মেঝেতেও রোগী

চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। আইসিইউ শয্যা ও অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্কটও প্রকট হচ্ছে।

চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রামে একাধিকবার সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে নগরে শনাক্তের সংখ্যা বেশি থাকলেও, এখন পুরো জেলাতেই বাড়ছে করোনা রোগী।

অন্যদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুমিছিলে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নাম। নগরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলাতেও দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের সংখ্যা।

এছাড়া চট্টগ্রামে করোনা শনাক্তের হারও বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে আছে। চলতি সপ্তাহেই জেলায় একাধিকবার ৩০ শতাংশের বেশি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে।

চট্টগ্রামের সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতি

শনিবার (১০ জুলাই) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের ১ হাজার ৯০৭ নমুনা পরীক্ষায় ৬০৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৩৬ জন নগরের এবং ১৬৭ জন বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। একইসময়ে মারা গেছেন ৩ করোনা রোগী। এরমধ্যে ২ জন নগরের এবং ১ জন উপজেলার বাসিন্দা।
চট্টগ্রামে এ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৫৭ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের মোট ৬৪ হাজার ২৯৯ নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে।

আইসিইউ শয্যা ও অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্কট, হাসপাতালে বাড়ছে রোগী

চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এমনিতেই আইসিইউ শয্যা সংখ্যা অপ্রতুল। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে আইসিইউ শয্যা সঙ্কট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সরকারি হাসপাতালে একটি শয্যা পাওয়ার জন্য রোগীর স্বজনদের অনেক জায়গায় তদবিরের ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে করোনা রোগীদের একটি বড় অংশের শ্বাসকষ্ট থাকায় প্রয়োজন হচ্ছে প্রচুর অক্সিজেন সিলিন্ডার। এক্ষেত্রে আবুল খায়ের গ্রুপসহ চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অক্সিজেন সহায়তায় ইতোমধ্যেই এগিয়ে এসেছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও পর্যাপ্ত নয়। যে কারণে ব্যক্তি পর্যায় থেকে বিশেষায়িত হাসপাতাল, সর্বত্র এখন অক্সিজেনের জন্য চলছে চেষ্টা-তদবির, ছোটাছুটি।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, বিআইটিআইডি হাসপাতালসহ নগরের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর করোনা ইউনিটে প্রতিদিন বাড়ছে ভিড়।

নগরের করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর একটি আল মানাহিল হাসপাতাল। শুক্রবার (৯ জুলাই) আল মানাহিলের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়, আগে যেখানে আল মানাহিল হাসপাতালে একবার অক্সিজেন আনলেই তিনদিন চলে যেত, সেখানে এখন একইদিনে দুইবার করে অক্সিজেন আনতে হচ্ছে। প্রায় প্রত্যেক রোগীরই কম-বেশি অক্সিজেন সাপোর্ট লাগছে। পরিস্থিতি আসলেই অস্বাভাবিক।

পোস্টে আরও বলা হয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে আল মানাহিল হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন সারি সারি রোগী। বেড পূর্ণ হয়ে অনেকের ঠিকানা মেঝে, বারান্দা! এমনকি রোগীদের স্থান করে দিতে পরিচালক ও হাসপাতাল স্টাফদের কক্ষ ছেড়ে দিতে হয়েছে। তাও রোগীর জায়গা করে দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনেও কুলিয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। ট্রাকে ট্রাকে অক্সিজেন আনলোড হচ্ছে। এত অক্সিজেন ফুরিয়ে যাচ্ছে কিছু সময়ের মধ্যেই।

দুই বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আইসোলেশন সেন্টার চালুর প্রস্তুতি

চট্টগ্রামে করোনা শনাক্তের ঊর্ধ্বগতিতে উদ্বিগ্ন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনও। ইতোমধ্যেই নগরের দুটি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের করোনা আইসোলেশন সেন্টার আবার পুরোদমে চালুর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চট্টগ্রামে করোনাযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের পাশাপাশি আরও দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

নগরের হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল ও রেলওয়ে হাসপাতাল এখন করোনার বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত জানিয়ে তিনি বলেন, রোগীর ভিড় বাড়লে এই দুই হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তি করানো হবে।

নগরের জেনারেল হাসপাতালে করোনার শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। সিভিল সার্জন বলেন, প্রয়োজনে হাসপাতালটির করোনা ইউনিটকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে।

এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আইসোলেশন সেন্টার আবার চালু করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।

এদিকে চলমান করোনা সঙ্কটে নগরের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলোকেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা আছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের। প্রয়োজনে সাউদার্ন মেডিকেল কলেজসহ অন্যান্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে যেকোনো একটিকে করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল বা আইসোলেশন সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ।

সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আছে। প্রয়োজন পড়লে যেকোনো একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজকে করোনা চিকিৎসায় কাজে লাগানো হবে।

স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রমে গতি

সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতিতে নগরে করোনা রোগীদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের বেশ কয়েকজন অনুসারী ইতোমধ্যে নগরে করোনা রোগীদের ফ্রি পরিবহন সেবাসহ সেবা ও সচেতনতা নানা কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।

অন্যদিকে সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠনগুলোর মধ্যে আল মানাহিল ফাউন্ডেশন, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন, গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও করোনা সঙ্কটে মাঠে আছেন। মৃত করোনা রোগীদের দাফন-কাফন, সৎকার থেকে শুরু করে লকডাউনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণও করছে এসব সংগঠন।

এদিকে গত ১ জুলাই থেকে লকডাউন চলাকালে চট্টগ্রাম নগরীতে ‘হ্যালো ছাত্রলীগ’ অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করেছে নগর ছাত্রলীগ। করোনা রোগীদের মরদেহ ও রোগী পরিবহনের কাজে নিয়োজিত আছে এসব অ্যাম্বুলেন্স।

এ ব্যাপারে বায়েজিদ থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক সুলতান মাহমুদ ফয়সাল আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, গত ১ জুলাই থেকে আমাদের এই অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু হয়েছে। সরকারের ঘোষিত লকডাউনে আমাদের এই সেবা চালু থাকবে।

তিনি বলেন, এরআগেও করোনা পরিস্থিতিতে আমরা এ সেবা দিয়েছিলাম। তখন দুটি অ্যাম্বুলেন্স রোগী পরিবহনে ও একটি অ্যাম্বুলেন্স বিনামূল্যে মরদেহ পরিবহনে নিয়োজিত ছিল। সে সময় মোট ৪৩ জন রোগী এ সেবা পেয়েছিলেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এই সেবা কার্যক্রম স্থগিত করি।

তিনি জানান, জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পেতে 01819-886366, 01819-612177, 01824-934346, 01811-651827, 01825-359395 নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।

বাড়ছে সংক্রমণের পরিধি

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে নগর ছাড়িয়ে বিভিন্ন উপজেলাতেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংক্রমণের প্রথম ১২ মাসে গ্রামে তুলনামূলক কম শনাক্ত হলেও, এখন নগরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে উপজেলাগুলোতে।

গত কিছুদিনে চট্টগ্রামের পাঁচ উপজেলায় শনাক্তের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। উপজেলাগুলো হলো- ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড।

এরআগে শনাক্তের ঊর্ধ্বগতির কারণে ফটিকছড়ি উপজেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এছাড়া হাটহাজারীতে চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে নগরের বাকলিয়া থেকে কোতোয়ালি, পতেঙ্গা থেকে হালিশহর, অধিকাংশ এলাকাতেই করোনা রোগী মিলেছে। এরমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু এলাকাকে রেড জোনও ঘোষণা করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

সংক্রমণের ঝুঁকির পরও চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি ও বিধিনিষেধ না মানার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ও কোভিড-১৯ (ইআরপিপি) প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গণসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। মানুষকে সতর্ক করতে হবে। তবে আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না। অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। স্যানিটাইজার ব্যবহার বা সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, লকডাউন ও বিধিনিষেধ মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে প্রশাসনকে জোর খাটাতে হবে। কারণ দিনশেষে অবহেলার খেসারত তো সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে।

আলোকিত চট্টগ্রাম

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm