কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বন্দী। এতে ব্যাহত হচ্ছে কারা ব্যবস্থাপনা। একইসঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে বন্দী পরিবহন ও আদালতে হাজিরা দেওয়ার প্রক্রিয়াও। এ অবস্থায় কারাগারে বন্দীর চাপ কমাতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ায় ‘সাব-জেল’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা কর্তৃপক্ষ। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব সম্প্রতি পাঠানো হয়েছে কারা অধিদপ্তরে। পটিয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগের সন্দ্বীপ ও বাঁশখালী, কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়া, নোয়াখালীর হাতিয়া এবং বান্দরবানের লামায়ও সাব-জেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-প্রিজন) মো. ছগির মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ব্রিটিশ আমলে বিচারিক কার্যক্রমকে সহজ ও দ্রুততর করতে পটিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে চৌকি আদালত স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব আদালতে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট আসামিদের শহরের কারাগারে রাখতে হচ্ছে। ফলে তাদের আদালতে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময়, জনবল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন হয়।
ডিআইজি প্রিজন বলেন, পটিয়ায় একটি সাব-জেল নির্মাণ করা গেলে এসব আদালতের আসামিদের শহরে না এনে স্থানীয়ভাবে নিরাপদ হেফাজতে রাখা সম্ভব হবে। এতে বন্দীদের ভোগান্তি কমবে, পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষের জনবল এবং কর্মঘণ্টার অপচয়ও কমবে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে বর্তমানে মোট ১২টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় দুটি কেন্দ্রীয় কারাগার। এসব কারাগারে অনুমোদিত বন্দী ধারণক্ষমতা ৭ হাজার। কিন্তু বর্তমানে বন্দী রয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ বেশি বন্দী রয়েছে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৪৯ জন, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১ হাজার ৭৪২, রাঙামাটি জেলা কারাগারে ১৪৫, বান্দরবান জেলা কারাগারে ১১৪, খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে ৮১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে ৭৮০, কক্সবাজার জেলা কারাগারে ৮৩০, চাঁদপুর জেলা কারাগারে ৪৭৫, নোয়াখালী জেলা কারাগারে ৫০০, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে ২৯৫, ফেনী জেলা কারাগার-১-এ ৩৯২ এবং কারাগার-২-এ ১৭২ জন। অনুমোদিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বিভিন্ন কারাগারে বন্দীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারকে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত বন্দীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। প্রতিদিন এখানে প্রায় সাত হাজার বন্দী অবস্থান করে বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
অতিরিক্ত বন্দীর চাপ শুধু আবাসন ব্যবস্থাকেই সংকটাপন্ন করছে না; খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সাক্ষাৎ, আদালতে হাজিরাসহ কারা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাই সাব-জেলর এ উদ্যোগ নিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা পটিয়া। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরেই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে পটিয়া ও আশপাশের এলাকার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের চট্টগ্রাম শহরের কারাগারে রাখার পর আদালতে হাজির করতে হয়। একই বন্দীকে আদালতের তারিখ অনুযায়ী শহরের কারাগার থেকে পটিয়ায় নিয়ে আসা এবং পুনরায় চট্টগ্রাম কারাগারে ফেরত পাঠাতে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিপুল জনবল ও যানবাহন প্রয়োজন হয়। পথে দুর্ঘটনা, পালিয়ে যাওয়া বা হামলার আশঙ্কাসহ নানা নিরাপত্তাঝুঁকিও থাকে। পটিয়ায় সাব-জেল হলে স্থানীয় আদালতের মামলায় আটক বন্দীদের একটি অংশকে সেখানেই রাখা সম্ভব হবে। এতে আদালতে হাজিরা দেওয়ার ক্ষেত্রে দূরত্ব ও পরিবহন-নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ওপরও চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি-প্রিজন মো. ছগির মিয়া বলেন, কারাগারগুলোতে চাপ কমাতে হলে কোনো না কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। সে পরিকল্পনা মাথায় রেখে আমরা গত আগস্ট মাসের শেষদিকে অধিদপ্তরে লিখিতভাবে প্রস্তাবটি পাঠিয়েছি। উপজেলার বন্দীদের জেলায় আসার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
তিনি বলেন, শুধু বিদ্যমান কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আদালত ও বন্দীর অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত কারা অবকাঠামো গড়ে তোলা। সাব-জেল নির্মাণের প্রস্তাবটি কারা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে, যাতে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আসে। পরিকল্পিতভাবে এসব কারাগার নির্মাণ করা গেলে ধারণক্ষমতা সমন্বয়ের পাশাপাশি জেলা শহরের কারাগারগুলোর ওপর বন্দীর চাপও কমে আসবে।
কারা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দীদের দীর্ঘ দূরত্বে আদালতে আনা-নেওয়া প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বন্দী, কারারক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে একাধিক মামলার আসামিদের নিয়মিত বিভিন্ন আদালতে হাজিরা দিতে হলে বন্দী পরিবহনের চাপ আরও বেড়ে যায়। পটিয়ায় সাব-জেল স্থাপিত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্থানীয় আদালতগুলোর সঙ্গে কারা ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর সমন্বয় তৈরি হতে পারে। এতে আদালতকেন্দ্রিক বন্দী পরিবহন কমানো, নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস, কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং বন্দীদের মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে প্রথমে জমি নির্বাচন, অবকাঠামোগত নকশা, ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো চূড়ান্ত করতে হবে। এরপর দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা গেলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের একটি প্রশাসনিক ও কারা ব্যবস্থাপনা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
আলোকিত চট্টগ্রাম


