অধ্যাদেশের মাধ্যমে এনবিআর বিলুপ্ত করে মন্ত্রণালয় সদৃশ দুটি বিভাগ সৃজনের পদক্ষেপ ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ। সম্প্রতি ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়ে তিনি একটি বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ফেসবুক পোস্টে তানভীর আহমেদ উল্লেখ করেন— বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ নামে একটি বিভাগ আছে। রুলস অফ বিজনেস অনুসারে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ/কর সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন এই বিভাগেরই কাজ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান এবং এই বিভাগের সচিব একই ব্যক্তি হওয়ায় এবং এনবিআর নিজেই ডি-ফ্যাক্টো পলিসি নির্ধারণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায়, কর নীতি এবং বাস্তবায়ন পৃথক করার প্রশ্ন উঠে; যা খুবই যৌক্তিক। আইএমএফ সেই বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে আসে। আইএমএফ কর নীতি এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করতে বলেছিল। তারা সুনির্দিষ্ট কোনো বাস্তবায়ন পদ্ধতি চাপিয়ে দেয়নি কিংবা এনবিআরকে ভাগ করে মন্ত্রণালয় সদৃশ দুটো বিভাগ সৃজন করতে বলেনি। অর্ন্তবর্তী সরকার এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ (যা মূলত মন্ত্রণালয় কাঠামো) সৃজনের জন্য অধ্যাদেশ জারির পথ অবলম্বন করে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দৃশ্যত সহজ রাস্তা পরিত্যাগ করে জটিল রাস্তায় হাঁটা হয়েছে।
সহজ রাস্তাটি কী ছিল? অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে স্বতন্ত্র সচিব পদায়ন করে (যিনি আগের মতো এনবিআরের চেয়ারম্যান হবেন না) উক্ত বিভাগকে তার কর নীতি প্রণয়ন সংক্রান্ত ভূমিকা যথারীতি পালন করতে দেওয়া। আর এনবিআরকে তার স্বতন্ত্রভাবে নিয়োগকৃত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে (যিনি আগের মতো একইসাথে সচিব হবেন না) সেই নীতি বাস্তবায়ন করতে বলা। এনবিআর নিজে কোনো নীতি প্রণয়ন করবে না, সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্থিরীকৃত নীতি বাস্তবায়ন করবে। তাহলেই তো নীতি এবং বাস্তবায়ন পৃথক হয়ে যেত। রুলস অফ বিজনেসের পরিপালন নিশ্চিত হতো, প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতো না, এনবিআর বিলুপ্তির প্রস্তাবনায় কর্মচারীদের মধ্যেও নানা আশংকা/অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতো না। আর বাস্তবায়নকারী এজেন্সি হিসেবে এনবিআরকে অধিকতর কার্যকর করার জন্য যদি বিভক্ত করা আবশ্যক হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যেত। সেই সুপারিশে এনবিআরকে আয়কর, শুল্ক ও আবগারি এবং কাস্টমস— এই তিন ভাগে তিনজন ডিজির নেতৃত্বে বিভক্ত করার সুপারিশ ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। (ডিজি পদে কর্মকর্তাদের আপত্তি থাকলে চেয়ারম্যান পদ করাতেও কোনো সমস্যা ছিল না। সরকারি অনেক দপ্তর/সংস্থা গ্রেড-১ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে থাকে।) কিন্তু এভাবে না গিয়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিষয়টি অধিক নিশ্চিত করতে চাওয়ায়, সহজ বিষয় জটিল হয়ে গেছে।
প্রকৃতপক্ষে মন্ত্রণালয়/বিভাগ সৃজন করা এবং তার কার্যাবলী বন্টন-পরিচালনা করা সংসদের আইন বা অধ্যাদেশ দ্বারা নির্ধারিত হয় না, কখনো হয়নি এবং আইনত হতেও পারে না। সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুসারে সরকারের কার্যাবলী বন্টন এবং পরিচালনার একমাত্র instrument হচ্ছে সংবিধানের অধীনে সরাসরি জারিকৃত রুলস অফ বিজনেস। এখানে সংসদের আইন প্রণয়ন বা অধ্যাদেশ জারি করা যায় না। সংবিধান এই সুযোগ রাখেনি। দেখুন মাসদার হোসেন মামলার রায় কি বলে— ..the Constitution also conferred on the President the direct primary and plenary power of framing rules which even the parliament cannot frame and which have an immediate legislative effect. A plenary rule-making power of the president has the same legislative effect as an act of parliament. One example is article 55(6) of the constitution which provides that the president shall make rules for the allocation and transaction of the business of the government. [52 DLR (AD)]
সংবিধান কেন এই ক্ষেত্রে সংসদের আইনের scope রাখেনি? এখানেই আসে সেপারেশন অফ পাওয়ার/ব্যালেন্স অফ পাওয়ারের প্রশ্ন। আইন প্রণয়নের inherent ক্ষমতা মহান সংসদের, কিন্তু সেটি unconditional নয়, হতে হবে সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে [অনুচ্ছেদ ৬৫(১)]। আর ৫৫(৬) অনুচ্ছেদে সংবিধান বলছে, সরকারের অভ্যন্তরীণ কার্যাবলী বণ্টন এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে হতে হবে রাষ্ট্রপতির বিধি, সংসদের আইন নয়। সরকারের কার্যাবলী বণ্টন এবং পরিচালনার বিষয়টা নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারের একান্ত নিজস্ব বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর domain। এই ফিলোসফিতেই এখানে আইন প্রণয়নের সুযোগ রাখা হয়নি, রাখা হয়েছে রাষ্ট্রপতির বিধির (রুলস অফ বিজনেস); যা প্রণীত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক। এই রুলস অফ বিজনেসের আইনি মর্যাদা বা force of law সংসদের আইনের বরাবর (দেখুন উপরের রায়ের অংশ) এবং Transaction & allocation of business of government and its ministries and division-এর ক্ষেত্রে এটিই সংবিধানের অধীন সর্বোচ্চ আইন ।
সদাশয় সরকারের প্রতি আমার সবিনয় প্রস্তাবনা— কর নীতি এবং বাস্তবায়ন পৃথকীকরণের উদ্দেশ্যে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে যথারীতি তার নীতি নির্ধারণী ভূমিকা পালন করতে দেওয়া হোক। বিভাগের সচিব এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান পদে পৃথক ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান করা হোক। এনবিআর নিজে কোনো নীতি প্রণয়ন করবে না; তবে প্রস্তাব করতে পারবে, expert opinion প্রদান করবে। দিনশেষে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্থিরীকৃত নীতি বাস্তবায়ন করবে। এনবিআরকে implementing agency হিসেবে অধিকতর শক্তিশালী এবং কার্যকর করার জন্য দুই/তিন ভাগে বিভক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে কর নীতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়াদি পর্যালোচনা/চূড়ান্তকরণের জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সকল ডিপার্টমেন্ট, স্টেকহোল্ডার এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা যেতে পারে। বাজেটের মতো বিশাল একটি বিষয় অর্থ বিভাগ যদি দীর্ঘদিন ধরে সামাল দিতে পারে, তাহলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে strengthen করাসহ সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে এই বিষয়টিও সুন্দরভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব।
এসব করা গেলে সব কুলই রক্ষা হয় বলে নিজের ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ।
আলোকিত চট্টগ্রাম


