৩ কারণে হালদায় মরছে ‘ডলফিন’

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ খ্যাত হালদা নদী। মিঠা পানির নদী মা মাছের জন্য অভয়ারণ্য। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মা মাছ এখানে ডিম ছাড়ে। উৎসবের আমেজে হাজার হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করে আহরণকারীরা।

মা মাছ ছাড়াও শুশুক বা ডলফিনের জন্যও পরিচিত হালদা নদী। গাঙ্গেয় শুশুক বা গ্যাংস রিভার ডলফিনদের বিচরণ এ নদীতে। মূলত যে নদীর পানি দূষণমুক্ত এবং যেখানে অন্যান্য মাছের সংখ্যা বেশি সেখানেই এসব শুশুক দেখা মেলে। কিন্তু বর্তমানে উদ্বেগজনক হারে কমতে শুরু করেছে এর সংখ্যা। প্রায় মৃত শুশুক পাওয়া যাচ্ছে নদীতে। শুধু নদী নয়, দেশের বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলেও ভেসে আসছে এ বিপন্ন প্রাণীটি।

সোমবার (৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাশ মুন্সিরহাট এলাকার নদী থেকে একটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করে নৌ পুলিশ৷ পরে তারা মৃত ডলফিনটি মাটিচাপা দিয়ে দেয়। এর চার দিন আগেও একটি মৃত ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল এ নদীতে।

আরও পড়ুন : এবার একসঙ্গে ভেসে এলো তিনটি মৃত ডলফিন

Yakub Group

স্থানীয়দের ভাষ্য, সোমবার সকালে মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাশ মুন্সিরহাট এলাকার নদীতে মৃত ডলফিন পানিতে ভাসতে দেখে নৌপুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে নৌ পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মৃত ডলফিনটি উদ্ধার করে এবং মাটিচাপা দেয়।

এর আগে হালদা নদী থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০টি ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর মৃত ডলফিন পাওয়া যায়।

এছাড়া ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে হালদায় ১৮টি মৃত ডলফিন পাওয়া যায়। ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পাওয়া যায় আরও ১০টি মৃত ডলফিন। কর্ণফুলী নদীতেও এ পর্যন্ত দুটি ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

মূলত তিন কারণেই ডলফিনের এ দুর্গতি। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবহার, কারেন্ট জালে মাছ ধরা এবং অবৈধ মৎস্যশিকারিদের কারণেই ডলফিনের এ দুর্গতি। হালদা নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবহার ও কারেন্ট জালে মাছ ধরা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন। কিন্তু তাতেও সুফল মিলছে না। নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে আটকে মারা যাচ্ছে ডলফিন। আবার অনেক জেলে শুশুক ধরে পেট কেটে তেল ও চর্বি বের করে নেয়। সেই তেল অনেকে বিক্রি করে। অনেকে মাছ ধরার জন্যও ব্যবহার করে থাকে।

এছাড়া নদীতে বাঁধ দেওয়া, সেতু তৈরি থেকে শুরু করে দূষিত বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপের কারণে বিপন্ন হতে শুরু করেছে মিঠা পানির এ শুশুক বা ডলফিন। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন’র লালতালিকায় স্থান পেয়েছে এ গাঙ্গেয় ডলফিন। এজন্য ১৯৯৬ সাল থেকে ডলফিনের নাম বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় ওঠে। অথচ প্রায় ৩০ বছর আগেও দেশের নদীতে প্রায় ডলফিনের দেখা যেত বলে জানান ডলফিন গবেষকরা।

সরকার বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এছাড়া বছর দেড়েক আগে সুন্দরবনের ৩১ কিলোমিটার জলজ এলাকা অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সচেতনতা বাড়াতে খুলনায় গত কয়েক বছর ধরে ‘শুশুক মেলা’ আয়োজন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন : ডলফিনের ময়নাতদন্ত—জালে আটকা পড়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু

সুন্দরবন ছাড়াও ৮১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হালদা নদীতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। নৌ পুলিশ এ ক্যামেরার সাহায্যে প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকা নজরদারি করবে। এছাড়া ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বালু উত্তোলন বন্ধের সিসিটিভি ক্যামেরা কাজে লাগবে।

পৃথিবীতে মিঠাপানির ডলফিন আছে চার প্রজাতির। এর মধ্যে চীনের নদীর ‘বাইজি’ নামের ডলফিন পৃথিবীতে থেকেই বিলুপ্ত হয়েছে গেছে অনেক আগে। পাকিস্তানের ইন্ডাস নদীতে এবং আমাজন নদীতে আছে আরো দুই প্রজাতির ডলফিন। আর সর্বশেষ যে প্রজাতি সেটি হল ‘ইরাবতী’ ডলফিন। যার একটা বড় অংশ আছে বাংলাদেশের নদীতে।

এসব শুশুক বা ডলফিনের গড় ওজন হয় প্রায় ১০০ কেজি। লম্বায় সর্বোচ্চ আড়াই মিটার পর্যন্ত হয়। হালদা নদীতে এমন ১৭০টি ডলফিন রয়েছে বলে জানিয়েছেন নদী গবেষকরা।

ডিসি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm