চট্টগ্রামে ‘পুলিশের সোর্স’—অপরাধী ধরতে গিয়ে বড় অপরাধে জড়াচ্ছে

দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে ‘পুলিশের সোর্স’ পরিচয় দেওয়া অপরাধীরা। এসব সোর্স জড়িয়ে পড়ছে বড় অপরাধেও। অপরাধীদের ধরতে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একাধিক কর্মকর্তা অঘোষিত নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করলেও কমছে না অপরাধ। আবার অপরাধী ধরাতে গিয়ে এসব সোর্স নিজেরাই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে তারা। বাড়তি ঝামেলায় জড়ানোর ভয়ে কেউ প্রতিকার চাচ্ছে না পুলিশের কাছে। হয়রানি শিকার হয়েও নীরব থাকাকেই ভালো মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

তবে সিএমপির এক জ্যোষ্ঠ কর্মকর্তা আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেছেন, নগর পুলিশের সোর্স নামে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। সোর্স পরিচয় দিলেই পুলিশকে খবর দেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

একাধিক সূত্র জানায়, তথ্য পাওয়ার জন্য সোর্স নামধারী এসব অপরাধীর সঙ্গে খাতির করে পুলিশ। অসাধু পুলিশের কাছে এ সোর্সরাই আবার ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’। তাদের মাধ্যমেই ‘টার্গেট’ করা ব্যক্তি থেকে ‘আটক বাণিজ্যের’ নামে হাতিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। আর টাকা দিতে রাজি না হলে জড়িয়ে দেওয়া হয় মামলার জালে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে, বিভিন্ন থানা এলাকার কথিত সোর্সদের ‘ভয়াবহ’ অপরাধের কাহিনী। যা আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করে সচেতন মহল।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশ সোর্সদের সরাসরি জড়িত থাকার ঘটনায় নগরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নগরের চকবাজার, চান্দগাঁও, সদরঘাট, ইপিজেড, ডবলমুরিং থানাসহ আরও কয়েকটি থানায় কথিত সেই সোর্সদের দৌরাত্ম্যে স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এসব সোর্সের ভয়ে আতঙ্কে দিন পার করতে হয়।

এদেরই একজন লম্বা নাছির। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। এসব মামলা থেকে বাঁচতে তিনি রাতারাতি বনে যান পুলিশের সোর্স। নগরের বহদ্দারহাট, কালামিয়া বাজার ও চকবাজার এলাকার মানুষ তাঁর নাম শুনলেই ভয়ে কেঁপে উঠেন। সন্ত্রাসী থেকে পুলিশের সোর্স হয়ে উঠার তাঁর গল্পটাও অন্যরকম।

আরও পড়ুন: ‘চুরির হাট’ ইপিজেড টু বিমানবন্দর সড়ক, ভাগ বসান পুলিশের সোর্স

গত আগস্টে নগরে ঘটেছে তিনটি ঘটনা। ৬ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নগরের পাহাড়তলী থানার সিডিএ মার্কেট সংলগ্ন একটি আবাসিক হোটেলে পুলিশের সোর্স পরিচয়ধারী সাব্বির (৩২), খোকন (৩০) ও মোবারক (২৫) পাহাড়তলী থানার উপপরিদর্শক রেজাউলের নেতৃত্বে হোটেলে ঢুকে পড়েন। এ সময় বোর্ডারের কাছ থেকে টাকা ও ফোন ছিনতাইয়ের প্রমাণ মিলে সিসিটিভি ফুটেজে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বোর্ডারের অভিযোগ, সোর্স মোবারক (নীল গেঞ্জি পরা) তাঁর স্ত্রীর ফোন এবং ১২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন। কিন্তু সোর্সকে রক্ষা করতে পুলিশ উল্টো তাদেরসহ সাতজনকে আদালতে চালান দেন। পরে জরিমানা দিয়ে তারা ছাড়া পান। ওই ঘটনায় পাহাড়তলী থানা থেকে সদ্য বদলি হওয়া ওসি হাসান ইমামকে সিসিটিভি ফুটেজ দিয়ে জড়িত সোর্সদের গ্রেপ্তার করার অনুরোধ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

যোগাযোগ করা হলে হোটেল ম্যানেজার আতিক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি রাতে অতিথির তালিকা থানায় জমা দিয়ে রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপরও সোর্সদের এমন অপতৎপরতা দুঃখজনক।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাহাড়তলী থানার নবনিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তথ্য প্রদানকারীকে সোর্স বলা হয়। তবে থানায় নির্দিষ্ট কোনো সোর্স নেই। পুলিশের কোনো কর্মকর্তার সোর্স পালন ও অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে গত ২৮ আগস্ট নগরের ডবলমুরিং থানার জোড় ডেবা লেকভিউ আবাসিক এলাকার ১২ কোয়ার্টারে র‍্যাবের কথিত সোর্স হৃদয় ছুরিকাঘাত করেন ফয়সাল (২৭) নামের এক যুবককে। এ ঘটনায় ডবলমুরিং থানায় মামলা দায়ের হলেও গ্রেপ্তার হয়নি হৃদয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন হৃদয়।

সূত্র জানায়, নগরের চকবাজার থানা পুলিশের কথিত দুই সোর্স হচ্ছেন—নাছির উদ্দিন ওরফে ল্যাডা নাছির ও সেকান্দর। নিজের মাকে হত্যাসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত নাছির বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ছিলেন ওই এলাকার ত্রাস। পুলিশের করা ‘শিবির ক্যাডারদের’ তালিকায় শুরুতেই তাঁর নাম রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ ‘পুলিশের সোর্স’ হিসেবে আবির্ভাব ঘটে নাছিরের। মূলত গ্রেপ্তার এড়াতেই সোর্স হিসেবে কাজ করছে নাছির।

চকবাজার থানা পুলিশের আরেক সোর্স আক্কাস। তিনি চকবাজারের বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশের পক্ষ হয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন। এছাড়া নিরীহ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে গ্রেপ্তারের বাণিজ্যেও রয়েছে তাঁর নাম। বছরখানেক আগে চকবাজার এলাকার ক্ষুব্ধ মানুষ কথিত সোর্স আক্কাসের কান কেটে দেয়। সেই থেকে ‘কানকাটা আক্কাস’ হিসেবেই তাঁর পরিচিতি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চকবাজার জামে মসজিদের বিপরীতে চক সুপার মার্কেটের পশ্চিম দিকের কোণায় সিটি করপোরেশনের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণ করেছেন আক্কাস। ইজারাদার সেটি তুলে দিলেও চকবাজার থানা পুলিশ আবার দোকানটি চালু করায়। সেই দোকান থেকে লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে ভাড়া দিয়েছেন আক্কাস।

এদিকে নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় আরেক কথিত সোর্স বেলাল হোসেন। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পশ্চিম জোনের ক্যাশিয়ার হিসেবে। কখনও আবার কথিত অনলাইন টিভির সাংবাদিকও বনে যান তিনি।।

নগরের আকবরশাহ এলাকার পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত হাসান। তাঁর নেতৃত্বে গোপনে চলে জুয়া ও মাদক ব্যবসা ব্যবসা। তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতি, ভূমি দখল ও মাদকে জড়িত থাকার একাধিক মামলা রয়েছে। ২০১৬ সালে অস্ত্র বিক্রির অভিযোগে নৌবাহিনীতে কর্মরত জসিম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি সোর্স হাসানের নাম উল্লেখ করেন।

চলতি বছরের ২ মে আকবরশাহ থানা এলাকার পাঞ্জাবি লেইন মুক্তকণ্ঠ মাঠে সোর্স হাসানের জুয়া ও মাদকের আসরে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৭ জনকে আটক করে। এ সময় সোর্স হাসান ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ইপিজেড থানা এলাকার বন্দরটিলা, হাসপাতাল গেইট থেকে আকমল আলী রোড, এস আলম-বি আলম গলিজুড়ে অবাধ বিচরণ পুলিশের কথিত চার সোর্সের। তাঁরা হলেন- জাহাঙ্গীর, রাজু, রফিকুল ও ক্যাশিয়ার সুলতান। দুই শতাধিক দোকান থেকে প্রতিদিন ছয় হাজার টাকা মাসোহারা পান ‘পুলিশের লোক’ পরিচয় দেওয়া এই চারজন।

গত ১ আগস্ট পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে সন্ত্রাস ও ছিনতাইয়ে জড়িত মনির নামের একজনকে টাইগারপাস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে খুলশী থানা পুলিশ।

এর আগে ২৯ জুলাই রাত ১০টার দিকে টাইগারপাস রেলের সীমানায় ঢুকে মনির ও তার কয়েকজন সহযোগী মাদকসেবনের চেষ্টা করেন। এ সময় নৈশপ্রহরী সুকুমার দাশ বাধা দিলে তাঁকে মারধর করা হয়। স্থানীয় যুবক শাকিল প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করেন মনির। এই মনির এলাকায় মাদক সেবন, মাদকব্যবসা, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং এলাকার সুপারিওয়ালাপাড়ায় এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে প্রধান আসামি চান্দু মিয়া এলাকায় পরিচিত ‘পুলিশের সোর্স’ হিসেবে।

একই থানা এলাকায় একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাত করেন ড্রাইভার আইয়ুব আলীকে। তিনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে রিকশায় লালখানবাজার থেকে বারিক বিল্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীরা তাকে ছুরিকাঘাতে ঘরে। এরপর মারা যান ড্রাইভার আইয়ুব। এ ঘটনায় আটক হন পাঁচজন। এদের মধ্যে বাবু নামে এক আসামি সদরঘাট থানা পুলিশের ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত।

সম্প্রতি মাদারবাড়ি এলাকায় মুন্না নামের এক গাড়িচালকের মোবাইল ছিনিয়ে নেন বাবু। এরপর স্থানীয়রা বাবুকে মারধর করে উদ্ধার করে মোবাইল। কিন্তু সদরঘাট থানার এসআই মাহতাব উল্টো ঘটনার শিকার মুন্নাকে হয়রানি করেন। পুলিশের ভয়ে মুন্না এলাকা ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন অনেকদিন।

আরও পড়ুন: ‘গোয়েন্দা পুলিশের ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে পথে পথে ‘চাঁদাবাজি’

২০২০ সালের জুলাইয়ে সাদা পোশাকে পুলিশী অভিযানে এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনাকে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালানোর চেষ্টা করে পুলিশ। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কথিত দুই সোর্সকে সঙ্গে নিয়ে ডবলমুরিং থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বাদামতলীর বড় মসজিদ গলির একটি বাসায় অভিযানে যান। দুই সোর্সের সঙ্গে মিলে মারুফ নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধর করেন। একপর্যায়ে মারুফের কাছ থেকে টাকা দাবি করে পুলিশ। পরে তাকে আটকের চেষ্টা করা হলে পরিবারের সদস্যরা বাধা দেন। ধস্তাধস্তিতে ওই কিশোরের মা ও বোন আহত হন। পরে পুলিশ তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাতে নিজ বাসা থেকেই মারুফের ‘ঝুলন্ত লাশ’ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে সাদা পোশাকে অভিযানে যাওয়া এসআই হেলাল উদ্দিনকে পরে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

জানা গেছে, সেদিন এসআই হেলালের সঙ্গে যাওয়া দুই সোর্সের মধ্যে সুপারিওয়ালাপাড়ায় কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় আটক চান্দু মিয়াও ছিলেন।

এসব ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (পশ্চিম জোন) আবদুল ওয়ারীশ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নিজেদের বাঁচাতে পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে থাকেন। যারা এমন পরিচয় দেন তাদের বিষয়ে তথ্য জানালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm