কঠোর হচ্ছে আ.লীগ—সিআরবির হাসপাতালবিরোধী ‘নেতারা’ দলীয় নজরদারিতে

সিআরবিতে হাসপাতালবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় নজরদারিতে রয়েছেন। তাদের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই— এমন মানসিকতায় এগোচ্ছে কেন্দ্র। লোক জড়ো করে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা হচ্ছে কি-না তাও নজরে রয়েছে। সিআরবিতে হাসপাতাল স্থাপনের বিরুদ্ধে এক নেতার চলমান আন্দোলনকে বাড়াবাড়ির চোখেও দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ। অযৌক্তিক এ আন্দোলনে চট্টগ্রামের কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার হুঙ্কারকে ভালো চোখে দেখছে না কেন্দ্র।

এদিকে এটিকে ‘উদ্দেশ্যমূলক ও হীন স্বার্থের আন্দোলন’ বলে মনে করে কেন্দ্র। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মলনকে সামনে রেখে কয়েকজন নেতা লাইমলাইটে আসার জন্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন, এমনটাই মনে করেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তবে এতে তারা সফল হবেন না। বরং আওয়ামী লীগ বরাবরই এমন কর্মকাণ্ডে কঠোর অবস্থানে থাকে বলে মত দেন তারা। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেখানে পরিবেশে নিয়ে বেশ আন্তরিক, এর চেয়ে বেশি আন্তরিক দেখানোর বিষয়টিকে বাড়াবাড়ি।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক জ্যোষ্ঠ নেতা আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, দেখুন সিআরবির হাসপাতাল প্রকল্প এলাকায় গাছের বিষয়টি নিয়েও সরকার আন্তরিক। কিন্তু প্রকল্প এলাকাটির অধিকাংশই বস্তির দখলে ছিল। সেখানে তেমন প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল না। বরং এসব বস্তি নিয়ে গণমাধ্যমেও নেতিবাচক খবর ছাপানো হয়েছে বহুবার। অথচ আন্দোলন করা হচ্ছে পরিবেশ রক্ষার। পরিবেশের ক্ষতির কথা বলে কোনো আওয়ামী লীগ নেতা আন্দোলনের নামে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কাজ করছেন কি-না তা নজরে রাখা হয়েছে। এছাড়া অশালীন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য কিংবা শিষ্টাচারপরিপন্থী কোনো কাজ করা হচ্ছে কিনা তাও নজরে রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত প্রকল্পকে সমর্থন করে যারা বক্তব্য দিয়েছেন, তারাও নিশ্চয়ই জনগণের বিষয়টি মাথায় রেখে রাজনীতি করেন। এ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতাদের সবারই মাথায় রাখা উচিত ছিল। এছাড়া দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সরকারের অনুমোদিত হাসপাতাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে যারা কথা বলছেন, তাদের মনে রাখা উচিত আওয়ামী লীগ গণমানুষের রাজনৈতিক দল ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি।

আরও পড়ুন: সিআরবি ‘আন্দোলনের’—আওয়ামী লীগ ‘নেতাদের’ পদত্যাগ চান মাহতাব উদ্দিন

তিনি আরও বলেন, শেষমেষ হাসপাতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘরে ফিরতে হবে, এমন কঠোর বার্তাও আসতে পারে কেন্দ্র থেকে—কঠোরতার সঙ্গে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ৮- আসনের সাংসদ মোছলেম উদ্দিন আহমদ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চট্টগ্রামবাসী স্বাস্থ্যের দিকে খুবই দুর্বল। আমাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য আরও হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। সিআরবিতে হাসপাতাল হওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশবান্ধব মানুষ। উনি চট্টগ্রামবাসীকে ভালোবাসেন বিধায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন করছেন। যার কারণে উনি সবকিছু বুঝেই হাসপাতাল করার জন্য বলেছেন।

তিনি আরও বলেন, সিআরবিতে যেখানে বৈশাখী মেলা বসে মানুষ মনে করছে সেখানে হাসপাতাল হচ্ছে। আসলে সেখানে হচ্ছে না। হাসপাতাল হচ্ছে সিআরবির গোয়ালপাড়ায়। যেখানে কিছু টিনের ঘর রয়েছে। সিআরবিতে বর্তমানে যে হাসপাতালটি রয়েছে তাও তো পাহাড়ে। তাতে তো পরিবেশ নষ্ট হয়নি। এখনও হবে না। আমরা সবাই পরিবেশবান্ধব, পরিবেশ নষ্ট না হয় মতো হাসপাতাল করা হবে।

আরও পড়ুন: ‘সিআরবি রক্ষা আন্দোলন’—বিস্ফোরক মন্তব্য সাংসদ মোছলেম উদ্দীনের

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতা আরও বলেন, দেখেন পাহাড়ের ওপর চক্ষু হাসপাতাল হয়েছে। ইমপেরিয়াল হয়েছে, ইউএসটিসি কলেজ হয়েছে তখন তো পরিবেশ নষ্ট হয়নি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সব করা হয়েছে। এটাও সেভাবে করা হবে। আর যারা সিআরবি রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন তাদের ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু পরিবেশ নষ্ট না হয় মতো হাসপাতাল করা হবে। যেমন বায়েজিদ আউটার রিং রোড করা হয়েছে তাও তো পাহাড় কেটে পরিবেশ নষ্ট না হয় মতো করা হয়েছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়ন চান। যদি হাসপাতালটি করা না হয় তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কষ্ট পাবেন। সিআরবিতে হাসপাতাল হবে— এটাই আমার বিশ্বাস।

নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, এটি সরকারি কাজ। সিআরবিতে হাসপাতাল হবে কী হবে না সেটি সরকার বুঝবে। আর প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন কী দেননি আমি জানি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি চান হাসপাতাল হবে তাহলে অবশ্যই হবে। আর সিআরবি ইস্যু নিয়ে এতো গোলমাল সৃষ্টি করার তো কোনো কারণ দেখছি না। এটা তো সিম্পল বিষয়। আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অনুপম সেন, এমপি মোছলেম উদ্দিন, প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীরা আছেন। ওনারা চাইলে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে হাসপাতাল হবে কী হবে না তা ক্লিয়ার করা যায়।

তিনি আরও বলেন, কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী সিআরবিতে আন্দোলন-সমাবেশ করছেন, এর তো কোনো মেরিট আমি দেখছি না। আর আমি আন্দোলনের পক্ষেও না, বিপক্ষেও না। আমি সরকারের পক্ষে। সরকার যেটা ভালো মনে করবে সেটা হবে। এই সরকার পরিবেশবান্ধব। পরিবেশ বিনষ্ট করে কিছু করবে না। যা করবে পরিবেশ নষ্ট না হয় মতো করা হবে। সরকার যা সিদ্ধান্ত নিবে আমি সেটার পক্ষে।

এ বিষয়ে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চসিকের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, সিআরবির যে স্থানে হাসপাতালের কথা বলা হচ্ছে, এটি সিআরবির মূল পয়েন্টে না, গোয়ালপাড়ায়। ওইস্থানে কিছু বস্তিঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। বলা যায়, গোয়ালপাড়ার রেলওয়ের বেশিরভাগ জায়গাই অবৈধ দখলে ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিআরবি হাসপাতাল প্রকল্পটি দেখানো হচ্ছে শিরিষতলাকে। যেখানে শতবর্ষী গাছ রয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘হাসপাতালবিরোধী আন্দোলনে’ এবার জুতার বাড়ির ‘বাড়াবাড়ি’—হঠাৎ সুর বদল সুজনের

তিনি প্রশ্ন করেন, হাসপাতালবিরোধী আওয়ামী লীগ নেতা প্রকল্পের স্থানের ছবির বদলে নিজের ফেসবুকে শিরিষতলার যেসব ছবি পোস্ট করছেন, তা কি উস্কানিমূলক নয়? সময়সময়ে এক ঘণ্টার জন্য সিআরবিতে এসে, ব্যানারে নিজের ছবি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের নামে লোকজন জড়ো করে ছবি তোলার প্রতিযোগিতা কেন?

সাবেক এ মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আরও হাসপাতাল প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চান। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলার আগে ওই নেতার দরকার ছিল দলীয় ফোরামে কথা বলা। কিন্তু তা করা হয়নি। বরং প্রকল্পের বিরোধিতার নামে শৃঙ্খলাভঙ্গের চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য কি-না তাও ভেবে দেখা দরকার।

এসি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm