যেভাবে আছে হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

৭ ভাগে চলছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একমাত্র মেগা প্রকল্প পটিয়া উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের কাজ। ১ হাজার ১৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকার এ প্রকল্পে রয়েছে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো, খাল পুনঃখনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী তীর সংরক্ষণ, ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণ। কোন অবস্থায় আছে মেগা প্রকল্পের কাজ— দেখে নেওয়া যাক আলোকিত চট্টগ্রামের বিশেষ প্রতিবেদনে।

প্রকল্পের ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে ১১টি খাল পুনঃখননের ৪টি প্যাকেজের কাজ ইতোমধ্যে শতভাগ শেষ হয়েছে। সেচ অবকাঠামো (স্লুইস গেট) ২৬টির মধ্যে ৯টির কাজ শেষ এবং ১৪ চলমান। দুটির কাজ শিগগির শুরু হবে। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য আরেকটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ কাজের অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া ২৫.৫১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের মধ্যে প্রায় ১২.৫০ কিলোমিটার কাজ ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

এ মেগা প্রকল্পের আওতায় নদীর তীর সংরক্ষণ ৪টি প্যাকেজের মধ্যে ২টির কাজ শেষ হয়েছে এবং গড় অগ্রগতি ৯২ শতাংশ। ২.৯৫ কিলোমিটার কাজের প্রায় ২.৫৫ কিলোমিটার কাজ শেষ। শ্রীমাই খালের প্রতিরক্ষা কাজ এখনো চলমান।

এছাড়া চান্দখালী নদীতে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ কাজ চলছে। জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের নাইখাইন গ্রামে এটি নির্মিত হচ্ছে। এর দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার, প্রস্থ ৩ মিটার।

৪.১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণকাজের ৫টি প্যাকেজের ১টি শেষ হয়েছে, তিনটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং ১টির কাজ শুরু হয়েছে। গড়ে ৮৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

তবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ১৭ শতাংশ। ৫৮.৯২৮ হেক্টর জায়গার মধ্যে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৬৩.৯৪ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ১১টি প্রস্তাবের মাধ্যমে ডিসি অফিসে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি প্রস্তাবের ডিএলসি মিটিং সম্পন্ন হয়েছে এবং ২টি প্রস্তাবের ৪ ধারার যৌথ তদন্ত শেষ হয়েছে। উপজেলার গৈড়লা, নাইখাইন, জঙ্গলখাইন ও বাথুয়া মৌজায় ৪ ধারার নোটিশ যা ডিসি অফিস ও পাউবোর যৌথ তদন্তের কাজ শেষ করা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রস্তাবসমূহও প্রক্রিয়াধীন, বলছে পাউবো।

পটিয়া পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণকৃত সম্পূর্ণ জমির ক্ষতিপূরণই সংক্ষুদ্ধরা পাবেন। এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এছাড়া সেচ প্রকল্পের পুরোপুরি সুফল পেতে হলে প্রকল্পের সব কাজ সমাপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আর্থসামাজিক ও কৃষিক্ষেত্রে পটিয়া উপজেলার আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প চাষের আওতায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমিতে নতুনভাবে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে এবং প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার একর জমি লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা পাবে, তথা অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসবে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাউবোর নেওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা হচ্ছে।

পাউবো চট্টগ্রাম ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পের বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল নির্মাণ, বেড়িবাঁধ ও সিসি ব্লকের বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজসহ ভৌত কাজের ৬১ শতাংশ শেষ করা হয়েছে। ১১টি খালের নাব্যতা ফেরাতে ৩০ কিলোমিটার খনন ও প্রকল্প এলাকায় ২৬টি রেগুলেটর (স্লুইস গেট) স্থাপন করার মধ্যে ১৪টির কাজ চলমান। ব্লক নির্মাণ, বসানোসহ সব ধরনের কাজ দৃশ্যমান হয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার পথেই। এতে পটিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ জলাবদ্ধতা নিরসন, ভাঙনরোধ ও সেচ সুবিধা পাবে। এছাড়া উপজেলার  আশিয়া, হাবিলাসদ্বীপ, ধলঘাট, বড়লিয়া, দক্ষিণ ভূর্ষি, জঙ্গলখাইন, নাইখাইন, ভাটিখাইন, ছনহরা, কচুয়াই, হাইদগাঁও, কেলিশহর ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, জোয়ারের পানি থেকে এলাকার ফসল, রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি রক্ষাকল্পে পটিয়ার মুরালি থেকে কর্ণফুলী সেতু এলাকা পর্যন্ত সাড়ে ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও খাল খনন করা হচ্ছে। পটিয়া ও কর্ণফুলী উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় ১৪ হেক্টর এলাকার জমি নিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়ায় ২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনসহ যোগাযোগ ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে।

এদিকে পটিয়ার শ্রীমাই খালে মাল্টিপারপাস হাইড্রলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের কাজ চলছে। ১৩৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রীমাই খালে ড্যাম নির্মাণের ফলে পাহাড়ি ঢলসহ বর্ষা মৌসুমের বিপুল পরিমাণ জলরাশি সংরক্ষণের মাধ্যমে ১ হাজার ১০৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে। এছাড়া শ্রীমাই খালের উভয় তীরে ৪.৪০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজ করার মাধ্যমে ভাঙন প্রতিরোধ হবে। ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প এলাকায় হাইড্রলিক ড্যামকেন্দ্রিক ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মৎস্য সম্পদ উন্নয়নসহ প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হবে। স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি হবে। প্রকল্পটি ৫টি প্যাকেজের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হবে। এর মধ্যে ড্যাম নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক প্যাকেজ ১টি, বাকি ৪টি নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ।

প্রকল্প-প্রস্তাবে বলা হয়েছে, হাইড্রলিক এলিভেটর নির্মাণের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি ২০১৩ সালের ৩ থেকে ৯ মে চীনে অবস্থিত কয়েকটি হাইড্রলিক এলিভেটর ড্যাম পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে দেশের পার্বত্য এলাকায় পাইলটভিত্তিতে অন্তত দুটি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করে একটি কারিগরি প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। পরবর্তী সময়ে হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সম্ভাব্য অবস্থানগুলো পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে চীনের বিআইসির একটি বিশেষজ্ঞ দলকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

২০১৫ সালের ২২ থেকে ২৯ জুন চীনা দলটি দেশে এইচইডি নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে উপযুক্ত স্থান শনাক্তকরণের পটিয়ার শ্রীমাই খাল, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার মন্দাকিনী নদী এবং খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদীসহ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করে। চীনা দলটি পটিয়ার শ্রীমাই খাল এবং দীঘিনালার মাইনী নদীতে হাইড্রলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পটিয়ার শ্রীমাই খালে ড্যাম নির্মাণের প্রকল্প নেয়।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের আশা, ড্যাম নির্মাণের ফলে পাহাড়ি ঢল ও বর্ষা মৌসুমের বিপুল পরিমাণ জলরাশি সংরক্ষণ করে প্রায় তিন হাজার একর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া যাবে। যা পরবর্তীতে সেচ খাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরো বাড়বে। পাশাপাশি পটিয়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের নদীর তীর সংরক্ষণ করে প্রকল্প এলাকায় নদীভাঙন রোধ সম্ভব হবে। এছাড়া মৎস্যসম্পদ রক্ষা, ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে আরও বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পানি স্বল্পতার জন্য প্রকল্প এলাকায় সেচ কাজসহ অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ অঞ্চলে ড্যাম এবং রিজার্ভার নির্মাণের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢালসহ বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। যা প্রয়োজনে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে। পানি সংরক্ষণ ও নদীপথের ল্যান্ডইপিং, সেচের পানি সংরক্ষণ, নদীর ধারণ ক্ষমতা বর্ধনসহ নানা প্রকল্পে এইচইডি (হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম) একটি নতুন প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি অনেকটা রাবার ড্যামের মতো। তবে আধুনিক নির্মাণশৈলী ব্যবহৃত হওয়ায় এর সুবিধা রাবার ড্যামের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। চীনা প্রতিষ্ঠান বিআইসি হাইড্রলিক এলিভেটর ড্যাম (এইচইডি) প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছে। চীনে এ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।

এ ব্যাপারে পাউবোর চট্টগ্রাম ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, এইচইডি প্রকল্পের হাইড্রলিক এলিভেটর ড্যামটি পাউবোর জন্য নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় প্রকল্প অনুমোদনের পর চূড়ান্ত নকশা প্রণয়ন ও আনুষঙ্গিক দর অনুমোদনে সময় লেগেছে। ইতোমধ্যে কাজটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়f তীর প্রতিরক্ষার চারটি প্যাকেজেরই কাজ চলতি অর্থবছরে সমাপ্ত হবে বলে আশা করছি।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm