দীর্ঘ ১৮ বছর পর পুনরায় চালু হওয়া প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ঘিরে পটিয়ায় তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে দেখা যায় নতুন উদ্দীপনা। তবে সেই উদ্দীপনার মাঝেই সামনে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের অনুপস্থিতিই এই উদ্বেগের কারণ।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবারের পরীক্ষায় মোট ১ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করার কথা। কিন্তু প্রথম দিনের বাংলা পরীক্ষায় অনুপস্থিত ৬৭৮ জন শিক্ষার্থী। পরদিন ইংরেজি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৬৮২। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির এ ধারা অব্যাহত ছিল শুক্রবারের (১৭ এপ্রিল) গণিত পরীক্ষা এবং শনিবারের (১৮ এপ্রিল) বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান পরীক্ষায়ও। এ দুদিন শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি যথাক্রমে ৬৮৩ জন এবং ৬৮৪ জন।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের এই অনুপস্থিতি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। কেন এত অনুপস্থিতি জিজ্ঞেস করা হলে পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কর্মকার আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, এই পরীক্ষা মূলত গত বছরের ডিসেম্বরে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় তা পিছিয়ে যায়। এখন যারা পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা ইতোমধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে গেছে। প্রায় চার মাস ধরে তারা নতুন ক্লাসে পড়ছে। ফলে পঞ্চম শ্রেণির অনেক বিষয় ভুলে গেছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে নিজ এলাকা ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যত্র ভর্তি হয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে এসে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তেমন সাড়া পাইনি।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পটিয়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু হওয়াটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সময় নির্বাচনটা যথাযথ হয়নি। শিক্ষার্থীরা এখন ভিন্ন সিলেবাসে পড়ছে। এতে তাদের আগ্রহ কিছুটা কমে গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন শিক্ষক বলেন, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অন্য জেলায় চলে গেছে। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতার চিত্র কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরীক্ষা দিতে না যাওয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ইসহাক মিঞা। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার সন্তান এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। হঠাৎ আগের ক্লাসের পড়া নিয়ে পরীক্ষা দিতে বলা হয়েছে। প্রস্তুতির জন্য সে যথেষ্ট সময় পায়নি, তাই পরীক্ষা দিতে যায়নি।
কয়েকজন অভিভাবক বলেন, দীর্ঘদিন পর বৃত্তি পরীক্ষা চালু হওয়ায় ভালো লাগছে। যারা প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা অংশ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে সময়মতো আয়োজন হলে অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
পরীক্ষার আয়োজন ও নিয়মনীতি অনুসারে এবারের পরীক্ষায় সরকারি বিদ্যালয় থেকে ১ হাজার ৭৫৯ জন এবং বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে ৮৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে বালক ৯৭৪ জন এবং বালিকা ৮৬৯ জন। পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়, এই দুই কেন্দ্রে চলছে পরীক্ষা।
এবারের বৃত্তির কাঠামো ও নীতিমালা অনুযায়ী ‘ট্যালেন্টপুল’ ও ‘সাধারণ’ দুই ক্যাটাগরিতে বৃত্তি দেওয়া হবে। মেধা তালিকায় ছাত্র-ছাত্রী সমান হারে (৫০%) নির্বাচন করা হবে। মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, অনুপস্থিতি বেশি হলেও আমি বিশ্বাস করি, মেধাবী শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। আমরা স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজন করেছি। আশা করছি প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হবে।
সর্বশেষ ২০০৮ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু হলে এর ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি দেওয়া হতো। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও এই পরীক্ষা চালু হওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরলেও অনুপস্থিতির হার ভবিষ্যতের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোকিত চট্টগ্রাম
