চসিকের ২৬ নম্বর হালিশহর ওয়ার্ডে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগের তীর ওই ওয়ার্ডের সচিব ইসতিয়াক আহমেদ ও ডিলার মো. আবু জাফরের দিকে। কিন্তু তাদের অপকর্মের কোনো প্রমাণ নেই। তবে আলোকিত চট্টগ্রামের সরেজমিন অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে অনিয়মের চিত্র। এ ঘটনায় ডিলারকে শোকজ করা হবে বলে জানিয়েছেন টিসিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের অফিস প্রধান।
বুধবার (২৯ মে) বেলা ১২টায় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, নগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব ইসতিয়াক আহমেদের সঙ্গে যোগসাজশে ডিলার মেসার্স ফাতেমা স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আবু জাফর প্রতিমাসে এক বা দুটি পণ্যের চালান কালোবাজারের বিক্রি করে দেন। আজ সকালে পণ্য নিয়ে গাড়ি ওয়ার্ডে যাওয়ার কথা থাকলেও যায়নি। এসব পণ্য কালোবাজারের বিক্রি করে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।
এমন তথ্যের সত্যতা খুঁজতে প্রতিবেদক এদিন বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে ২৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিসে গিয়ে দায়িত্বরত সচিব আবু জাফরের কাছে টিসিবির পণ্যবাহী গাড়ি কোথায় জানতে চান। এসময় সচিব জানান, গাড়ি আসতেছে। তিনি অফিসে না থাকাতে ডিলার গাড়ি নিয়ে আসেনি। এরপর তিনি ডিলারকে ফোন করে দ্রুত আসতে বলেন।
আরও পড়ুন : টিসিবির ট্রাক আসতেই কমে গেল পেঁয়াজের দাম!
এরপর দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে চালভর্তি একটি ট্রাক নিয়ে ডিলার আবু জাফর কাউন্সিলর অফিসের সামনে আসেন। এসময় তার কাছে টিসিবির পণ্যবাহী গাড়ি কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাড়ি এখন যানজটে আছে, কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পৌঁছাবে।
পরে সচিব-ডিলার চালবাহী গাড়ি নিয়ে ওয়ার্ড অফিসের কয়েকজনকে সাদেক শাহ মাজার সংলগ্ন চৌধুরীপাড়ায় যেতে বলেন। এরপর দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়িটি নিয়ে চৌধুরীপাড়ায় যান ডিলার আবু জাফরসহ আরও কয়েকজন।
এদিকে ওয়ার্ড অফিসে আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে চৌধুরীপাড়ায় টিসিবি পণ্য বিক্রির স্থানে গিয়ে দেখা যায়, পণ্যবাহী গাড়ি তখনও আসেনি। তবে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে চালের বস্তা।
বিষয়টি তৎক্ষনাৎ টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয় চট্টগ্রাম অফিস প্রধান যুগ্ম পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামকে জানালে তিনি প্রতিবেদকের মুঠোফোনে পাশে থাকা ডিলার আবু জাফরের কাছে গাড়ি কোথায় জানতে চান। এসময় তিনি গাড়িটি যানজটে আছে বলে জানান। অবশেষে দুপুর ৩টা ১২ মিনিটে টিসিবির পণ্য নিয়ে আসে সেই গাড়ি।
এসময় জানতে চাইলে ওয়ার্ড সচিব ইসতিয়াক আহমেদ জানান, তিনি ওয়ার্ড অফিসে না থাকাতে গাড়ি আসতে দেরি হয়েছে।
গাড়ি দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে ডিলার আবু জাফর জানান, গাড়ি নষ্ট হয়েছিল। ড্রাইভারকে ডিজ্ঞাসা করেন। নষ্ট গাড়ির কাজ কোথায় করা হয়েছে জানতে চাইলে চালক জানান, স্টিলমিল আনোয়ার মেকানিকের কাছে। নষ্ট গাড়ি উল্টো পথে কীভাবে গেল সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি চালক।
টিসিবির ভোক্তাদের কয়েকজন জানান, গাড়ি আসলেই আমরা জানতে পারি টিসিবির পণ্য দেওয়া হবে। তখন আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য সংগ্রহ করি। কতো পণ্য বরাদ্দ, কখন গাড়ি আসবে তা আমরা কেউ জানি না। কাউন্সিলর অফিস যেভাবে চায় সেভাবেই হচ্ছে। দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে টিসিবির পণ্য হাতে পেয়ে প্রতিবেদককে অনেকে ধন্যবাদ জানান এবং পণ্য বিতরণ কার্যক্রম সুষ্ঠু তদারকি দাবি জানান তারা।
টিসিবির অফিস সূত্রে জানা গেছে, টিসিবির পণ্য নিতে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে টিসিবির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিসে প্রবেশ করে মেসার্স ফাতেমা স্টোরের একটি মিনি ট্রাক। সাড়ে ৫শ জন ভোক্তার জন্য ১১শ কেজি ডাল ও ১১শ লিটার তেল নিয়ে গাড়িটি গাড়ি সকাল ১০টায় টিসিবি অফিস থেকে বের হয়। ইপিজেড টিসিবি অফিস থেকে পণ্য বিক্রির স্থান সাদেক শাহ মাজার সংলগ্ন চৌধুরীপাড়ার ৯ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছাতে গাড়িটির সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা সময় লাগার কথা। কিন্তু রহস্যজনক চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গাড়িটি কোথায় ছিল এর সঠিক উত্তর দিতে পারেননি সচিব, ডিলার, কাউন্সিলর কিংবা টিসিবির কর্তাদের কেউই।
আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ানোর কষ্ট ভুলিয়ে দিচ্ছে চিনি—খেজুর
এ বিষয় জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ইলিয়াছ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, পণ্য নিয়ে গাড়ি দেরিতে আসার কারণ টিসিবি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ডিলার ভালো বলতে পারবে। আমার ওয়ার্ডে এলে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
কালোবাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই জানিয়ে কাউন্সিলর বলেন, ভোক্তারা পণ্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে আমি ক্লিয়ারেন্স কপিতে স্বাক্ষর করি। অন্যথায় আমার স্বাক্ষর নেওয়া এত সহজ নয়।
সচিবের যোগসাজশের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোক্তাদের পণ্য পাওয়ার বিষয়টি আমি নিজস্ব লোক দিয়ে যাচাই করি। সচিবের কথায় আমি কিছু করি না।
এসব বিষয়ে টিসিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের অফিস প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মেসার্স ফাতেমা স্টোরের পণ্যবাহী গাড়িটি টিসিবি অফিস থেকে সকাল ১০টায় বের হয়। হালিশহর পণ্য বিক্রির স্থানে যেতে কোনোভাবেই এত সময় লাগার কথা নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারকে শোকজ করা হবে। সঠিক উত্তর দিতে না পারলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরবি/আলোকিত চট্টগ্রাম


