রাস্তা—ফুটপাত দখল করে ‘জমজমাট’ বিরিয়ানি বাণিজ্য, প্রশ্নের ৩ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযান

জে জাহেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিরিয়ানির দোকান। এ বিষয়ে কর্ণফুলীর ইউএনও ও এসিল্যান্ডের কাছে জানতে চাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যেই চালানো হয়েছে অভিযান।

শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক ও চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের মিল্কভিটার সামনে অভিযান চালান এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রয়া ত্রিপুরা। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সহযোগিতায় পরিচালিত এ অভিযানে মইজ্জ্যারটেকের আকাশ ওরশ বিরিয়ানি হাউস এবং ওসমানি ওরশ বিরিয়ানি দোকানকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

অভিযোগ ছিল, মইজ্জ্যারটেক, চরলক্ষ্যা ও সৈন্যেরটেক এলাকার ফুটপাত দখল করে এবং রাস্তায় চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কিছু ব্যবসায়ী বেপরোয়া ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে যানজট বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে এসব অনিয়ম আরও গভীর হচ্ছে। তবে দ্রুত অভিযানের কারণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। স্থানীয়দের আশা, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালানো হলে সড়ক দখলের সমস্যা কিছুটা হলেও কমবে

ফুটপাত দখল, রাস্তাও

মইজ্জ্যারটেক মোড় সংলগ্ন আবাসিক সড়কের মুখে আকাশ ওরশ বিরিয়ানি হাউস মূল সড়কের ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালাচ্ছে। এমনকি আবাসিক সড়কের কালভার্টের উপর গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হচ্ছে। যা স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।

একই চিত্র চরলক্ষ্যা মিল্কভিটা গেইটেও। সেখানে ওসমানি ওরশ বিরিয়ানি রীতিমতো রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালাচ্ছে। প্রায় ১০০ পরিবারের চলাচলের রাস্তায় প্রকাশ্যে মাংস রান্না, চেয়ার পেতে বসা, রাস্তার ওপর চুলা বসিয়ে রান্না করা যেন স্বাভাবিক ব্যাপার।

এদিকে সৈন্যেরটেক খোয়াজনগর এলাকার সরকারি রাস্তা দখল করে গড়ে উঠছে থ্রি-স্টার বিরিয়ানি, হাসির বিরিয়ানি, ফার্মেসি ও কসমেটিকসের দোকান। এসব অবৈধ দোকানের কারণে এলাকাবাসী প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে।

জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ব্যর্থতা

গত কয়েক মাসে কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। অনেকেই মৌখিকভাবে কর্ণফুলীর ইউএনও এবং সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) অভিযোগ করলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের দাপ্তরিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাঠপর্যায়ে অনিয়ম রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ফলে বাজারে অস্থিরতা, রাস্তা দখলসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারি ছিল শূন্যের কোটায়।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই দখলদারদের মদদ দিচ্ছেন। সাধারণ জনগণ প্রতিদিন অবৈধ দোকানগুলোর কারণে দুর্ভোগে পড়লেও তাদের সহায়তার জন্য কেউ এগিয়ে আসছেন না।

পরিস্থিতি বিপজ্জনক

এভাবে রাস্তা দখল করে দোকান বসানোর কারণে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। সিএনজি অটোরিকশ্ ও ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের অভিযোগ, ক্রেতাদের ভিড়ের কারণে প্রতিদিনই রাস্তা ব্লক হয়ে থাকে। ফলে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রচুর সময় লাগে।

মিল্কভিটা সড়কে বসবাসকারী গ্রামবাসীরা জানান, দোকানের সামনে দিয়ে চলাচল করতে হলে গরম মাংসের হাঁড়ি, চুলার আগুন এবং রান্নার ধোঁয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হয়। এমনকি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও সমস্যায় পড়তে হয়।

একইভাবে সৈন্যেরটেক এলাকায় পুরাতন সেতুর উপর একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে ভারি যানবাহন চলাচল করে। এতে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে।

মিল্কভিটা সড়কে বিরিয়ানি খেতে আসা মোবারকও স্বীকার করলেন, গ্রামে প্রবেশের প্রধান সড়কের মুখে এভাবে দোকান বসানো অনুচিত। প্রচুর মানুষ এখানে আসছে, এ কারণে যানজট বাড়ছে।

এদিকে চরপাথরঘাটা খোয়াজনগর সৈন্যেরটেক মোড়ের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন পাশের ডিভাইন ও জিএসএল কোম্পানির কর্মী আজম ও শাহিনা বেগম৷ তাঁরা বলেন, তিন রাস্তার মোড়ে সরকারি জায়গা দখল করে একের পর এক দোকান বসছে। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয় তবে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকানগুলো সরানো দরকার।

ব্যবসায়ীদের সাফাই

এই বিষয়ে জানতে চাইলে আকাশ ওরশ বিরিয়ানি হাউসের মালিক মো. আকাশ বলেন, আমি আমার দোকানের সামনে কোনো গাড়ি রাখি না। সিডিএ আবাসিক সড়কের মুখে গরু জবাই করেছি, এটা সত্য। কিন্তু কেউ তো নিষেধ করেনি। গতকাল সিডিএ রাস্তা বন্ধ করে দিলেও আপাতত আমাদের ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।

তবে মানুষের চলাচলের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নীরব থাকেন।

অপরদিকে ওসমানি ওরশ বিরিয়ানি হাউসের মালিক মো. ওসমান গণি বলেন, রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তেমন হচ্ছে না। কেউ এদিক দিয়ে গেলে আমরা জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলি। আর এই সড়কে তেমন বসতি নেই। শুধু একটি ইবাদতখানা, মিল্কভিটা ও একটি পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপের গুদাম আছে। আমি একটি জায়গা কিনেছি, শিগগরই সেখানে দোকান সরিয়ে নেবো। কর্ণফুলীতে আমিই প্রথম ওরশ বিরিয়ানি শুরু করি। এখন অনেকেই এই ব্যবসায় নেমেছে। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।’

থ্রি স্টার বিরিয়ানির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সৈন্যেরটেক মোড়ের আলহাজ আব্দুল মজিদ মার্কেটের মালিক কামাল উদ্দিন বলেন, আমি এলাকার বাইরে আছি, কেউ আমাকে বিষয়টি জানায়নি। তবে খোঁজ নিচ্ছি। রাস্তার ওপর দোকান করা ঠিক নয়, আমি বিষয়টি দেখছি।

খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন

কর্ণফুলীর বিভিন্ন স্থানে বিরিয়ানি ব্যবসার প্রসার দেখে চরলক্ষ্যা গ্রামের জসিম উদ্দিন জুয়েল বলেন, এখানকার বিরিয়ানিতে অতিরিক্ত তেল, চর্বি ও টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করা হচ্ছে, অত্যন্ত নিম্নমানের ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ দ্রুত শারীরিক সমস্যায় পড়বে।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিএসসিআর হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মু. ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, গরুর মাংসসহ চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চর্বি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ায়, যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই সুস্থ হৃদযন্ত্র বজায় রাখতে চিকিৎসকরা কম চর্বিযুক্ত প্রোটিন, শাকসবজি ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm