রায়ে সন্তুষ্ট নন নেজাম পাশার সন্তান, খুনির সর্বোচ্চ সাজায় যাবেন হাইকোর্টে

নগরের খুলশী থানার নেজাম পাশা (৬৫) হত্যা মামলায় আসামি মো. হাছানকে (৪৫) যাবজ্জীবন সাজাসহ অর্ধলাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত।

রোববার (২৬ মে) সকালে চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞার এ রায় দেন।

এদিকে রায় প্রকাশের পর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নেজাম পাশার মেয়ে ফাতেমা খানম জমজমসহ তাঁর পরিবার। বাবার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিতে উচ্চ আদালতে যাবেন বলে জানান তিনি।

দণ্ডপ্রাপ্ত হাছান ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব আজিমপুর আদর্শ বাজার হাফেজ এমরান বাড়ির মৃত আমির হোসেনের ছেলে। তিনি নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ জমির হাউজিং সোসাইটির ভিআইপি কাঁচা রাস্তার মাথা এলাকায় নেজাম পাশার নির্মাণাধীন একটি ভবনের দারোয়ান ছিলেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে জমির হাউজিং সোসাইটির ভিআইপি কাঁচা রাস্তার মাথা এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের পাশেই আনিসুর রহমানের প্লটের সামনের দেয়াল ঘেঁষে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় নেজাম পাশার লাশ। এ ঘটনায় নেজাম পাশার স্ত্রী সেলিনা ইয়াছমিন বাদী হয়ে মামলা করেন খুলশী থানায়।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ট্রিপল মার্ডার—২ খুনির ফাঁসি

খুনের বর্ণনায় নিহতের মেয়ে জমজম বলেছিলেন, ২০১৯ সালে জালালাবাদ এলাকায় আমাদের বাড়ির কাজ শুরু হয়। ভবন দেখার দায়িত্বে ছিলেন হাছান। ফটিকছড়ির আজাদি বাজারের ধর্মপুর এলাকার গুড়া মিয়া মিস্ত্রি বাড়ি থেকে গিয়ে নির্মাণকাজ তদারকি করতেন আব্বু। আবার খুলশীতে বড় আপুর বাসায়ও থাকতেন। দারোয়ান হাছান খুলশী এলাকায় থাকার সুবাদে এলাকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। সন্ত্রাসীরা হাছানের মাধ্যমে ভবনের বিভিন্ন কাজের কন্ট্রাক্ট চাইতেন আব্বুর কাছে। হাছানও সন্ত্রাসীদের পক্ষ হয়ে ভবনের বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দিতে আব্বুকে সুপারিশ করতেন। কিন্তু হাছানের এসব সুপারিশে আব্বু রাজি না হয়ে নিজের কাজ নিজে করতেন। সেই থেকে দারোয়ানের সঙ্গে আব্বুর বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে হাছানের অন্যায় আবদারে বিরক্ত হয়ে আব্বু তাকে চাকরি থেকে বের করে দিতে চেয়েছেন।

খুনের দিনের ঘটনার কথা উল্লেখ করে জমজম বলেন, ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় ফটিকছড়ি থেকে বিল্ডিংয়ের কাজ তদারকি করতে যান আব্বু। আব্বুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত আমার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ওইদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আব্বুর ফোন বন্ধ পাই। এরপর শঙ্কিত হয়ে বিষয়টি জানালাম পরিবারের অন্যদের। কিন্তু সবাই বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেন। পরে রাত পৌনে ১১টায় আব্বুর নম্বর থেকে আমার নম্বরে কল আসে। কল রিসিভ করলে ওদিক থেকে হাছান বলেন, আপনার আব্বা রানীর হাট গেছেন। তিনি এখনও আসেননি। বিল্ডিংয়ের কিছু জিনিসপত্র পাঠিয়েছেন। ড্রাইভার দিয়ে উনার মোবাইলও পাঠিয়েছেন। বকেয়া থাকা ২০ হাজার টাকাগুলো দিতে বলেছেন। প্রতিউত্তরে আমি জানালাম, আব্বু তো এমন কাজ করেন না। আমি আব্বুর সঙ্গে কথা বলে জানাবো। এসময় দারোয়ান কল কেটে দেন। পরে দারোয়ানের নম্বরে কল দিলে তিনি সন্দেহজনক কথাবার্তা বলেন। আব্বু কোথায় জানতে চাইলে বলেন, তোমার আব্বু কোথায় আমি জানি না। এর আগে আব্বুর নম্বর থেকে কল দিয়ে তিনি যা বলেছেন সে কথাগুলো তিনি অস্বীকার করেন। এরপর তাকে ভাইয়ারা কল দিলে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলতে থাকেন। তার কথাবার্তা সন্দেহজনক হওয়াতে রাত ১২টায় পরিবারের লোকজন ফটিকছড়ি থেকে খুলশীতে যান।

মামলায় নিহতের স্ত্রী সেলিনা ইয়াছমিন উল্লেখ করেন, পরিবারের লোকজন রাত ২টায় খুলশীর নির্মাণাধীন ভবনে পৌঁছালে সেখানে আমার স্বামীকে খুঁজে পাইনি। পরে রাত সাড়ে ৩টায় খুলশী থানায় অভিযোগ করলে ভোরে নির্মাণাধীন ওই ভবনের পাশেই আনিসুর রহমানের প্লটের সামনের দেয়াল ঘেঁষে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় আমার স্বামীর লাশ।

২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি খুলশী থানার এসআই আনোয়ার হোসেন মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। নেজাম পাশাকে নিজের পরনের লুঙি ও তার দিয়ে হাত-পা বেঁধে খুন করা হয়েছে উল্লেখ করা হয় ওই চার্জশিটে। পরে আদালত চার্জ গঠন করে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ মুরাদ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ১৬ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় আসামি হাছানকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া লাশ গুমের চেষ্টা করায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর নেজাম পাশার ছেলে হোসাইন মো. ফয়সাল আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে উচ্চ আদালতে আপিল করবো।

সহমত পোষণ করেন ফাতেমা খানম জমজমও।

আরএস/আরবি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm