জরায়ুমুখ ক্যানসার—টাকা ছাড়াই চট্টগ্রামে মিলবে টিকা, গুজবে কান নয়

চট্টগ্রাম মহানগর ও ১৫ উপজেলায় ২৪ অক্টোবর থেকে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি ও ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের কিশোরীদের জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হবে। জাতীয় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা দেওয়ার এ প্রস্তুতি নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়। তবে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে অনেকেই টিকা নিতে শঙ্কায় ভুগছেন। এছাড়া টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়ানো হচ্ছে গুজব। তবে এসবে কান না দিয়ে নির্ভয়ে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকায় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সামান্য জ্বর কিংবা শরীর ব্যাথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়া এ টিকাতে বন্ধ্যাত্ব হওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। কিশোরী বয়সে এইচপিভি টিকা নিলে নারীদের জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। এর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এই ক্যানসারে বেশি নারী প্রাণ হারান। দেশে প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ১১ জন জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার ৯৭১ জন নারী মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষার (স্ক্রিনিং) পাশাপাশি এইচপিভি টিকা নেওয়ার মাধ্যমে এ ক্যানসার প্রতিরোধ ও মৃত্যু হ্রাস সম্ভব।

সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, সবধরনের ট্রায়াল অতিক্রম করে বেলজিয়ামের তৈরি এই টিকা পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি ও ১০ থেকে ১৪ বছরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহির্ভূত কিশোরীদের দেওয়া হচ্ছে। এ টিকাতে গুরুতর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। দ্বিতীয় বৃহত্তম জরায়ু ক্যান্সার থেকে সারাজীবন মুক্তি পেতে এটি কিশোরীদের জন্য বেশ উপযোগী। এ টিকা এক ডোজই যথেষ্ট। এই টিকা কিশোরীদের মাঝে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর হতে পারে।

এদিকে এইচপিভি টিকা প্রদান উপলক্ষে গত মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) দুপুর ৩টায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে আয়োজন করা হয় জেলা পর্যায়ের সাংবাদিক ওরিয়েন্টেশন। এতে সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এইচপিভি টিকায় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই কম। কোভিড ভ্যাকসিনে যেরকম আতঙ্ক ছিল এবার তেমন কিছুই নেই। সামান্য জ্বর কিংবা শরীর ব্যাথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বেলজিয়ামের তৈরি এই টিকা সবধরনের ট্রায়াল অতিক্রম করে কিশোরীদের দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া টিকার গুণগত মান নিশ্চিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে এ টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসবের কোনো ভিত্তি নেই। নিশ্চিন্তে ও নির্ভয়ে টিকা নিতে পারবে কিশোরীরা। অভিভাবকদের অনুরোধ করবো গুজবে যাতে কান না দেন।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে কিশোরীরা পাবে বিনামূল্যে এইচপিভি টিকা—যখন যেভাবে পাবে

তিনি জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে মাসব্যাপী এ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। এদিন সকাল ৮টায় নগরের জামালখান এলাকার ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে বিভাগ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের এ ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব। এ লক্ষ্যে সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলবে এ কার্যক্রম। ১৭ ডিজিটের জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন এবং জন্মনিবন্ধনবিহীন কিশোরীদের হোয়াইট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে ক্যাম্পেইনের প্রথম ১০ দিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রসমূহে এবং পরবর্তী ৮ দিন স্থায়ী ও অস্থায়ী কেন্দ্রসমূহে টিকা দেওয়া হবে।

ওরিয়েন্টেশনে জানানো হয়, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার ৪ হাজার ৩৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩০ জন কিশোরী ও স্কুলবহির্ভূত কমিউনিটির ৭ হাজার ৫১৮ জন কিশোরীসহ মোট ৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৪৮ জন এবং সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কিশোরীকে এইপিভি টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এমওসিএস ডা. মো. নওশাদ খানের সঞ্চালনায় ওরিয়েন্টেশনে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এসআইএমও ডা. এফএম জাহিদুল ইসলাম। এতে উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এমওডিসি ডা. মো. নুরুল হায়দার, এসএমও (ম্যালেরিয়া), ডা. মো. আবুল কালামসহ দপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী।

এদিকে চট্টগ্রাম নগর এলাকার ১০ থেকে ১৪ বছরের বয়সী এক লাখ ৩৬ হাজার কিশোরীকে বিনামূল্যে এইচপিভির টিকা দেবে চসিক। প্রথম ধাপে ১০ দিন পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের এবং দ্বিতীয় ধাপে পরবর্তী ৮ দিন স্কুলবহির্ভুত ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সের কিশোরীদের টিকা দেওয়া হবে।

২২ অক্টোবর সকালে নগরের মেমন জেনারেল হাসপাতাল মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এসময় যে কোনো ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

এতে উপস্থিত ছিলেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মু. তৌহিদুল ইসলাম ও প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. ইমাম হোসেন (রান্না) এবং ইউনিসেফের প্রতিনিধি ডা. প্রসূন রায় ও ডা. তপন চক্রবর্তী।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm