এসএসসিতে ১৯ বছরে সর্বনিম্ন পাস! নেপথ্যে কী

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ড চলতি বছর পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত ১৯ বছরের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার!

এদিকে মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একইসঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়াকেই ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী।

গত বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন!

এ বছর শুধু ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। এসব বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় আরও খারাপ হয়েছে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল পরীক্ষায় এবার ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জিপিএ-৫ পায় ৬ হাজার ৭১৬ জন।

কোন বোর্ডে কত পাস

ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, জিপিএ–৫ ৯ হাজার ৩৯৮ জন। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, জিপিএ–৫ ১৬ হাজার ১১৩ জন। কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, জিপিএ–৫ ৯ হাজার ৮১৪ জন। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, জিপিএ–৫ ১১ হাজার ৪৭৮ জন। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জিপিএ–৫ ২ হাজার ৭৭৮ জন। সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, জিপিএ–৫ ৩ হাজার ৮৩৬ জন। দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, জিপিএ–৫ ১৩ হাজার ৬৩৯ জন। ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, জিপিএ–৫ ৫ হাজার ৭০০ জন।

১৯ বছরে সর্বনিম্ন

গত দেড় দশকের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল বিশ্লেষণে এবারের ফলের অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছায়, যা ছিল ওই সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ হার। পরে মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার ধরনে বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণে পাসের হারে ওঠানামা দেখা যায়।

২০১৭ সালে খাতা মূল্যায়নে নতুন মানদণ্ড প্রয়োগের পর পাসের হার কমে ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে আসে।  পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে করোনাকালে। ২০২১ সালে বিষয় ম্যাপিং ও বিশেষ মূল্যায়নের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করায় পাসের হার বেড়ে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা এ যাবৎকালের অন্যতম সর্বোচ্চ হার।

করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক পরীক্ষাপদ্ধতি ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা ফিরলে পাসের হার আবার কমতে শুরু করে। গত বছর ২০২৫ সালে পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। আর এবার তা আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ! অর্থাৎ ২০০৭ সালের পর গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী পাস করেছে।

শতভাগ পাস কমেছে, বেড়েছে শূন্য পাস

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অন্যদিকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি—এমন শূন্য পাস বা জিরো পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১২টিতে।

কেন এই বিপর্যয়?

এবারের ফল বিপর্যয়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অকৃতকার্যতার বিষয়টি। এ দুটি মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা নিয়ে।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm