প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সবাই যেন শান্তি ও নিরাপদে বসবাস করতে পারেন, এমন একটি দেশ গড়তে চান তারা। একইসঙ্গে সন্তানদের জন্য স্কুল-কলেজে নিরাপদ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে দুপুর ৩টার দিকে বাঁশখালীর জনসভা শেষে ফটিকছড়ির পাইন্দং সিএন্ডবি মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর। পরে সেখানে থাকা আমজনতা তাঁকে স্বাগত জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রী বুলেটপ্রুফ বাসে করে সড়কপথে ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় তাঁকে একনজর দেখতে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের দুপাশে উপস্থিত জনতার মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে উপস্থিত জনতার শুভেচ্ছার জবাব দেন।
এদিকে মতবিনিময় সভায় নির্বাচনের সময় সহযোগিতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে থেকে যে কাজ করেছি, যেভাবে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছি, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
তিনি বলেন, যারা ওই সময়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন, মাঠে কাজ করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেছেন—তাঁদের সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে কাজটি একসঙ্গে করেছি, সেটি আল্লাহর রহমত ও আপনাদের সহযোগিতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সমস্যা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
দেশের মানুষের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণকে যে কথা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে হবে। একজন মুসলমান হিসেবে কোনো অঙ্গীকার করলে তা রক্ষা করা দায়িত্ব। কথা রাখতে না পারলে কাজের কোনো মূল্য থাকে না।
তিনি বলেন, আমরা দেশের মানুষকে বলেছি—আমরা আপনাদের জন্য ভালো কিছু করতে চাই এবং ভালো কিছু করার চেষ্টা করব। আল্লাহ যেন আমাদের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার তৌফিক দেন। দেশের মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায় ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের পর বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। এর পরই রমজান শুরু হয়। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংকটের প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তেল, জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে জনগণের কাছে আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফটিকছড়ির মানুষের মাঝে আসতে পেরে তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাসপাতাল ও স্কুল প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আরও কাজ করতে হবে।
শিল্পকারখানা চালু রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাও হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে দেশের মানুষের আস্থা ধরে রেখে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
মতবিনিময় সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মুহাম্মদ হেলালউদ্দিন, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, মিরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়েজী ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও হেফাজত আমিরের ছেলে মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী, মাওলানা মহিউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা আজিজুল হক ইসলামীবাদী।
এ সময় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান সরকারপ্রধানের কাছে ৯টি লিখিত দাবি পেশ করেন। এগুলো হলো—
১. মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা।
২. কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞে জড়িত, হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিতের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৪. দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করা। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্সের সমমান) ডিগ্রির উল্লেখ করা।
৫. শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. চরম দ্বীন বিকৃতিকারী কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৮. আলেমদের বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে এ দেশের আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা।
৯. বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভারতের বিতর্কিত মাওলানা সাদ সাহেবের বাংলাদেশে আগমনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।
আলোকিত চট্টগ্রাম


