দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার আর সীমাহীন সময় অপচয়ের অবসান ঘটাতে এবার দাবি উঠেছে চামুদরিয়া ঘাটে একটি আধুনিক ‘ওয়াই’ (Y) টাইপ সেতু নির্মাণের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন একটি সেতুই বদলে দিতে পারে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র।
জানা যায়, পটিয়া, আনোয়ারা ও চন্দনাইশ— এই তিন গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত চামুদরিয়া ঘাটে বর্তমানে কোনো সেতু নেই। তাই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুরালী-চাঁনখালী খাল পারাপার করছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিনের এই যাতায়াত যেন একেকটি ঝুঁকির যাত্রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ছোট নৌকা দিয়ে খাল পার হয়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অথচ একটি সেতুই বদলে দিতে পারে আমাদের জীবন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল হামিদ বলেন, পণ্য পরিবহনে আমাদের অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে খরচ বাড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা। সেতু হলে আমরা লাভবান হবো।
স্থানীয় কলেজছাত্রী সুমি আকতার বলেন, নৌকা না পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরীক্ষার সময়ও থাকে এমন দুর্ভোগ। ঝড়-বৃষ্টিতে নৌকা দিয়ে পার হতে ভয় লাগে। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।
ঘাটের মাঝি রহিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ২-৩ হাজার মানুষ পারাপার করে। বর্ষায় দুর্ঘটনার ভয় থাকে।
এদিকে ওয়াই টাইপ সেতু নির্মিত হলে তিন উপজেলার এক সংযোগে যোগাযোগসহ সবকিছুতেই আমুল পরিবর্তন আসবে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পটিয়ার শোভনদন্ডী ইউনিয়নের লাউয়ারখীল এলাকা, চন্দনাইশের বরকল ইউনিয়নের কানাইমাদারী এলাকা ও আনোয়ারার শিলালিয়া-ওষখাইন অংশ— এই তিন প্রান্তকে যুক্ত করে প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ একটি ওয়াই টাইপ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংযোগ সড়ক (র্যাম্প) নির্মাণের মাধ্যমে তিন উপজেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এতে পিএবি সড়কের ওপর চাপ কমবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সেতু নির্মিত হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা যাবে, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ হবে, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থায় গতি আসবে।
স্থানীয় প্রকৌশলীরা বলছেন, এ ধরনের সেতু নির্মাণ করলে একটি কেন্দ্রবিন্দু থেকে তিনদিকে যান চলাচল সহজ হবে। যা দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক সংযোগ হাব তৈরি করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের এক দায়িত্বশীল প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রস্তাবটি আমাদের নজরে এসেছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক ডিপিপি প্রণয়ন বা ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়নি। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি।
চট্টগ্রাম সওজের আরেক কর্মকর্তা বলেন, যদি স্থানীয়ভাবে জমি ও সংযোগ সড়কের বিষয়গুলো সহজ হয়, তাহলে প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে বাজেট বরাদ্দ বড় একটি বিষয়।
এদিকে এ নিয়ে সামাজিক সংগঠন আনোয়ারা ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে।
চন্দনাইশ উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, এই সেতুটি নির্মিত হলে তিন উপজেলার মধ্যে যোগাযোগে বিপ্লব ঘটবে। আমরা বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
পটিয়া উপজেলার এক জনপ্রতিনিধি বলেন, এটি শুধু একটি সেতু নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করবে।
যোগাযোগ করা হলে আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দীন আহমদ শাহ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, এটি শুধু একটি সেতু নয়, এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের স্বপ্ন। দ্রুত বাস্তবায়ন হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে।
সাধারণ সম্পাদক এম নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, আমরা বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন পাঠিয়েছি। সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, দশকের পর দশক ধরে তিন উপজেলার মানুষ কষ্ট করছে। আমরা চাই দ্রুত একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত আসুক।
আলোকিত চট্টগ্রাম

