ফটিকছড়িতে তরমুজ চাষে চমক দেখিয়েছেন রাঙামাটির বরকল থেকে আসা ৭ বর্গাচাষি। না, চমকটা তরমুজ চাষের জন্য নয়। চমকটা এজন্য, তাঁরা এমন জমিতে বাম্পার ফলন ফলিয়েছেন যা ছিল পতিত!
সেচ সংকটে বছরের বড় সময়জুড়ে অনাবাদি পড়ে থাকত ফটিকছড়ির নাজিরহাটের মন্দাকিনী বিল। আমন মৌসুম শেষে বোরো চাষ না হওয়ায় হেক্টরের পর হেক্টর জমি থাকত পতিত। এবার সেই চিত্রই বদলে দিলেন সাত চাষি।
জানা গেছে, পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বরকল উপজেলা থেকে আসা সাত কৃষক স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি বর্গা নেন। প্রথমবারের মতো ৭৬ কানি জমিতে তাঁরা শুরু করেন তরমুজ চাষ। শুরুতে শঙ্কা থাকলেও শেষে মিলেছে বাম্পার ফলন! এতে ভীষণ খুশি ওই সাত চাষি।
তাঁরা জানান, সঠিক সময় চারা রোপণ, সার ও পরিচর্যার কারণে ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে তরমুজের চাহিদাও থাকায় ভালো লাভের সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।
এদিকে তাঁদের এই সাফল্যে তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও। স্থানীয়রা বলছেন, এতদিন যে জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেখানে সবুজ তরমুজের খেত। এতে শুধু জমির ব্যবহারই বাড়েনি, এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মন্দাকিনী বিলটি সেচ সংকটের কারণে বছরের বড় অংশজুড়ে পতিত পড়ে থাকত। সাতজন বর্গাচাষি এ বিলের ৭৬ কানি জমিতে গ্লোরি জাম্বু জাতের তরমুজ চাষ শুরু করেন। শুরু থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকরাও ভালো ফলন পেয়েছেন।
জানা যায়, সাত বর্গাচাষির সঙ্গে তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানেরাও সমানতালে জমিতে কাজ করছেন। তরমুজ খেতের পাশেই অস্থায়ী তাঁবু টানিয়ে তারা রাতযাপন করছেন। দিন-রাত পরিশ্রম করে ফসলের পরিচর্যা ও পাহারা দিচ্ছে পুরো পরিবার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কেউ গাছের পরিচর্যায়, কেউ আবার পাকা তরমুজ তুলতে ব্যস্ত।
কথা হয় বরকল থেকে আসা বর্গাচাষি মো. কাউসার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে এ জমি বছরের বেশিরভাগ সময়ই পতিত পড়ে থাকত। সেই জমিই এবার বর্গা নিয়ে আমরা সাতজন ৭৬ কানিজুড়ে তরমুজ চাষ করেছি। প্রথমবার হিসেবে ভালো ফলনও পেয়েছি। তরমুজ বিক্রি শুরু করেছি। পাইকাররা জমিতে এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
চাষি মো. বাবুল বলেন, শুরুতে ভয় ছিল, পানি নেই—ফসল হবে তো? কিন্তু আল্লাহর রহমত আর সঠিক পরিচর্যায় এখন ভালো ফলন পাচ্ছি। বাজারে দামও ভালো।
তিনি আরও বলেন, আমরা গ্লোরি জাম্বু জাতের তরমুজ চাষ করেছি। সময়মতো চারা রোপণ, সার প্রয়োগ এবং নিয়মিত দেখভালের কারণে বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে বৃষ্টি হলে পাকা ফসল পচে যাওয়ার ভয় কাজ করছে।
এদিকে সাত কৃষকের সাফল্য দেখতে প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ তরমুজ খেতে ভীড় করছে। এদেরই কয়েকজন বলেন, কৃষকদের সাফল্য দেখে আমরা খুশি। আগে এই বিল ফাঁকা পড়ে থাকত। এখন দেখলে মনে হয় অন্য জায়গা। তরমুজ চাষ দেখে আমরাও আগ্রহী হচ্ছি।
কৃষিসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগ সফল হওয়ায় আগামীতে আরও কৃষক তরমুজসহ অন্যান্য বিকল্প ফসল চাষে আগ্রহী হবেন। সঠিক পরিকল্পনা ও সহযোগিতা থাকলে মন্দাকিনী বিলের মতো পতিত জমিগুলোও হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ফটিকছড়ি কৃষিভিত্তিক একটি সম্ভাবনাময় উপজেলা। সেচ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন মন্দাকিনী বিল পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তবে এবার সাতজন বর্গাচাষি উদ্যোগ নিয়ে সেখানে তরমুজ চাষ শুরু করায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। শুরু থেকেই আমরা তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছি। এতে তারা ভালো ফলন পেয়েছেন, আর্থিকভাবেও লাভবান হয়েছেন।
আলোকিত চট্টগ্রাম


