লবণচাষিদের মরার ওপর খাঁড়ার ঘা

কালবৈশাখীর ঝড় ও বৃষ্টিতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ লবণমাঠ। একদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম, অন্যদিকে কালবৈশাখী ঝড় এবং বৃষ্টিতে লবণ মাঠের ক্ষতি— সবমিলিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন লবণচাষ ও বিপনণের সঙ্গে জড়িত ৫০ হাজার মানুষ।

চলতি সপ্তাহ তিন দিনে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল), বুধবার সন্ধ্যা এবং বৃহষ্পতিবার সকালের ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির পানিতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ লবণ মিশে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। খারাপ আবহাওয়ার কারণে মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় চাষিরা।

এমন পরিস্থিতিতে লবণ উৎপাদনে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়াও।

বিসিকের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছে। ৬ এপ্রিল পর্যন্ত লবণ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ টন। যা গত মৌসুমের তুলনায় চার লাখ ৪৯ হাজার টন কম।

গত মৌসুমে একই সময়ে সময় লবণ উৎপাদিত হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন। দেশে লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে চলতি মৌসুমে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, বাহারছড়া, হ্নীলা, রঙিখালি, ঝিমংখালী, খারাংখালী, মৌলভীবাজার, উপজেলা সদর, নাজিরপাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া ও শাহপরীরদ্বীপের বেশকিছু মাঠের লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা বেড বা কাই নষ্ট হয়ে গেছে।

শাহপরীরদ্বীপের লবণচাষি নুরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিতে চাষিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত সাত থেকে আট দিন সময় লাগবে।

তিনি বলেন, বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করেছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে।

নয়াপাড়ার লবণচাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, মঙ্গলবার এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশে ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেইসঙ্গে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণ বিক্রিও করা যাচ্ছে না। এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩০০ টাকা। আর বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করবো?

গত চার মাস লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দাদনের টাকা পরিশোধ করা দূরে থাক, সংসার চালাব কী করে ভেবে পাচ্ছি না।

সাবরাং এলাকার লবণচাষি আলী আহমদ বলেন, বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষদিকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে লবণমাঠের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আরও ১০ থেকে ১৫ দিন লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকবে। ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, কালবৈশাখীতে সব শেষ! এমনিতেই লবণের দাম কম। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করবো বুঝতে পারছি না।

যোগাযোগ করা হলে টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষী কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমদ আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, লবণ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবসার সঙ্গে টেকনাফে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ জড়িত। ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কবলে পড়ে লবণচাষিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। লবণ আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে।

লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, সম্প্রতি ঝড় ও বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদনে অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় বাড়বে। যা জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও শঙ্কা তৈরি করছে। বর্তমানে মাঠ ও মিল (কারখানা) পর্যায়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে ১০ লাখ ৭০ হাজার টন লবণ মজুত রয়েছে।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিসিক টেকনাফ লবণ কেন্দ্রের প্রধান মিজানুর রহমান আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চাষিদের আবার লবণ তুলতে ১০ দিন সময় লাগবে। লবণ মৌসুম শুরু থেকে এ পর্যন্ত টেকনাফে চার হাজার ৫৫০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার টন। আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামীতে আরও কিছু লবণ উৎপাদন করতে পারলে চাষিরা ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm