সরকারে আসার পর ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি হলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি। দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা ও সাংগঠনিক স্থবিরতার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হলেও তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো এখনও অগোছালো।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, কর্ণফুলী উপজেলা ও পৌর এলাকায় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কমিটি। উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করার এক বছর পার হলেও এখনো গঠন হয়নি নতুন কমিটি। ফলে জেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও মাঠপর্যায়ে দল চলছে অনেকটা অস্থায়ী ও ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থায়।
দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৃণমূলকে দ্রুত পুনর্গঠন করতে না পারলে বিএনপির জন্য এই সাংগঠনিক শূন্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন বলয়ের প্রভাব নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আওতাধীন উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের পুরোনো কমিটিগুলো বিলুপ্ত করে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিদ্ধান্তের দীর্ঘ সময় পরও সেই প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। ফলে বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মসূচি পালনে নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও জেলা পর্যায়ের নেতাদের নেতৃত্বে কর্মসূচি হচ্ছে, আবার কোথাও স্থানীয় নেতারা নিজেদের বলয়কে কেন্দ্র করে পৃথক কর্মসূচি পালন করছেন। এতে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে একদিকে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি, অন্যদিকে সাংগঠনিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
রাজনৈতিক-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একটি দলের মূল ভিত্তিই হচ্ছে ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের সক্রিয় সংগঠন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মী সংগঠিত করা, কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী প্রচারণা— সবকিছুর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো। সেই কাঠামো না থাকলে জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বের পক্ষে এককভাবে পুরো নির্বাচনী মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
এদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোও অনেকটা বৈপরীত্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে আহ্বায়ক, আলী আব্বাসকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, লিয়াকত আলী ও মিশকাতুল ইসলাম পাপ্পাকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং লায়ন হেলাল উদ্দীনকে সদস্য সচিব করে আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ওই বছরের ৬ মে ৫৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে ৯ জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ৪৩ জন সদস্য রয়েছেন। জেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পরও উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব না আসায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে ফিরেনি প্রত্যাশিত গতি।
দলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন— জেলা কমিটি যদি তৃণমূলের নেতৃত্বই দ্রুত নির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ের মাঠে কার্যকর সাংগঠনিক প্রস্তুতি কীভাবে সম্ভব?
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সংকট অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর ৬৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক এবং মোস্তাক আহমেদ খানকে সদস্য সচিব করা হয়। আলী আব্বাসকে করা হয় যুগ্ম আহ্বায়ক। পরবর্তীতে কমিটিতে পরিবর্তন এনে পটিয়ার বর্তমান সংসদ সদস্য এনামুল হক এনামকে ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে ওই কমিটি বেশিরভাগ উপজেলায় দিতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এবারও যদি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতি নতুন কমিটি গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আগের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হতে পারে— এমন শঙ্কা তৃণমূলে।
গত ২৩ জুন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া দলের চেয়ারম্যান বরাবরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আওতাধীন উপজেলা ও পৌরসভার কমিটি গঠনের অনুমতি চেয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
এর আগে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আওতাধীন ১৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের নতুন কমিটি গঠন করার লক্ষ্যে দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বায়োডাটা আহ্বান করেছিল জেলা বিএনপি। দু’দফায় সময়ের ব্যবধানে এসব ইউনিটের পদ প্রত্যাশী ১ হাজার ৯শ নেতাকর্মী তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক আমলনামা জমা দেন জেলা বিএনপি কার্যালয়ে। দক্ষিণ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে এটি সবচেয়ে বড় ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া বলেন, দক্ষিণ জেলার আওতাধীন মেয়াদ উত্তীর্ণ উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন কমিটি বাতিল করা হয়েছিল এক বছর আগে। এরই ধারাবাহিকতায় দলীয় নির্দেশনা মোতাবেক জেলা কমিটির মাধ্যমে সকল কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের দিকে উপজেলা ও পৌরসভা কমিটি গঠন করার জন্য বিভাগীয় কমিটির কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলে নির্বাচন উপলক্ষে বন্ধ রাখা হয়। সাংগঠনিক গতি বাড়াতে ইউনিট পর্যায়ে সকল নেতৃবৃন্দের দাবি, কমিটি পুনঃগঠন করা হোক। বর্তমানে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন কমিটি না থাকার কারণে সাংগঠনিকভাবে কোনো কার্যক্রম চলছে না। নেতাকর্মীদের এই হতাশা দূর করতে কমিটি গঠনের বিকল্প নেই।
জেলা বিএনপির এ নীতিনির্ধারক বলেন, যেহেতু সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনে নেতাকর্মীদের কাজে লাগাতে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন কমিটি ঘোষণা করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি। কমিটি না থাকলে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যাবে। ফলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয় করার জন্যই পুরোনো কমিটিগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্য, ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, তৃণমূল হচ্ছে বিএনপির মূল শক্তি। দীর্ঘদিন যারা দলের জন্য কাজ করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, তাদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি করা হবে।
অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে সংগঠনের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ব্যক্তিগত বলয়ের চেয়ে দলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আলোকিত চট্টগ্রাম


