ইউপি নির্বাচন—কমিটি গঠন, দক্ষিণে প্রার্থী হবেন যারা

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দক্ষিণ চট্টগ্রামে তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। ইউনিয়নভিত্তিক সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, দলীয় ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনী সক্ষমতা যাচাই করতে উপজেলাভিত্তিক ৪৮ সদস্যের পৃথক যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি। জেলার আটটি উপজেলায় সাংগঠনিক ইউনিটে এসব কমিটি কাজ করবে। কমিটির সবাই চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির নেতা বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া ও সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর জেলা বিএনপির জরুরি সাংগঠনিক সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দলীয় চিঠিতে বলা হয়, মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানো, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সমর্থিত প্রার্থী যাচাই-বাছাই, জনমত ও সাংগঠনিক অবস্থান পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করাই এ কমিটিগুলোর প্রধান দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে কমিটির নেতারা স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করবেন। একইসঙ্গে সাধারণ জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সরাসরি মতামত গ্রহণ করে বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনা করবেন।

যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ১০ দিনের মধ্যে জেলা বিএনপির কাছে গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, বর্তমান ও অতীতের সাংগঠনিক পদ এবং দায়িত্ব পালনের সময়কাল উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, প্রয়োজনে স্থিরচিত্র, মামলা-মোকদ্দমার বিবরণ, দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ও প্রতিবেদনে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি প্রার্থীর নির্বাচনী সক্ষমতা সম্পর্কেও মাঠপর্যায়ের তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ শুধু দলীয় পদ-পদবি কিংবা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একজন সম্ভাব্য প্রার্থী স্থানীয় জনগণের কাছে কতটা পরিচিত, দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান কেমন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে কতটা সক্রিয় এসব বিষয়ও যাচাই করবে কমিটি।

এদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা আগে থেকেই শুরু হয়েছে। কোথাও সাবেক চেয়ারম্যান, কোথাও ইউনিয়ন বিএনপির নেতা, আবার কোথাও দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতারা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দক্ষিণের সব উপজেলার ১৪০ ইউনিয়নেও বিএনপি নেতাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও মামলা-কারাবরণের বিষয় সামনে থাকবে। এ অবস্থায় কেন্দ্র বা জেলা পর্যায়ের একতরফা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মাঠপর্যায়ের মতামত সংগ্রহ করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা বিএনপি।

দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলে তাঁদের সাংগঠনিক অবস্থান, জনপ্রিয়তা ও পারস্পরিক সম্পর্কও পর্যালোচনায় আনা হবে। ২৯ সেপ্টেম্বরের সাংগঠনিক সভায়ও প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জেলা বিএনপির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উপজেলাভিত্তিক কমিটিগুলোর কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর আলোচনা-পরামর্শের মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফলে আপাতত ৪৮ সদস্যের কমিটির কাজ হবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি ও মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করা। এই তালিকাই চূড়ান্ত দলীয় সমর্থনের নিশ্চয়তা নয়, পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এটি হবে জেলা বিএনপির প্রাথমিক ভিত্তি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বে আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া এবং সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন রয়েছেন। ২০২৫ সালে ঘোষিত ৫৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতেও তাঁদের এই দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। ইউনিয়ন পর্যায়ে যাঁরা দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে আছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যাঁদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে, তাঁদের তথ্য মাঠপর্যায় থেকে উঠে আসতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু দলীয় পরিচয় থাকলেই হবে না, একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর সাংগঠনিক অবস্থান, অতীত ভূমিকা এবং জনগণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। মাঠের বাস্তবতা যাচাই করে যে তালিকা আসবে, সেটিই পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এর আগে জেলা বিএনপির দায়িত্ব গ্রহণের পর ইদ্রিস মিয়া দক্ষিণ জেলার প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের নিয়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার কথা জানিয়েছিলেন।

এদিকে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এজন্য কমিটির নেতাদের সাধারণ মানুষ, দলীয় নেতাকর্মী এবং স্থানীয় সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে চাই, যেখানে তৃণমূলের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে। কে কতদিন পদে ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু সবকিছু যাচাই করেই প্রতিবেদন দিতে হবে।

হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, প্রাথমিক তালিকা মানেই চূড়ান্ত প্রার্থী নয়। উপজেলাভিত্তিক কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর জেলা পর্যায়ে সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। আলোচনা-পরামর্শের মাধ্যমেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর আগে দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং বিভাজন এড়িয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন জেলা বিএনপির নেতারা। সবমিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এখন মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে কারা মাঠে সক্রিয়, কারা তৃণমূলে গ্রহণযোগ্য এবং শেষ পর্যন্ত কারা দলীয় সমর্থনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেন। আগামী ১০ দিনের মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের পর সেই চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন দক্ষিণের বিএনপি নেতারা।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm