চট্টগ্রামে ফিল্মি স্টাইলে জোড়া খুন, নেপথ্যে অন্ধকার জগতের খেলা

এটি বলিউডের কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। চট্টগ্রাম নগরের বাস্তব চিত্র। গভীর রাতেও চট্টগ্রাম নগরে, গুলির আওয়াজ। এক নয়, একের পর এক। রাতের আঁধারে এমন গুলির আওয়াজ, আগে কখনোই শুনেনি, ওই এলাকার মানুষ। যে মুহূর্তে গুলির আওয়াজ কানে ভেসে আসছিল রাত গভীর হলেও ঈদকে সামনে রেখে তখনও মানুষ ছিল। হঠাৎ থেমে যাওয়া গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালাচ্ছিল সন্ত্রাসী সরোয়ার ও তার দলবল। আর পালানোর আগেই থেমে যাওয়া তাদের গাড়িতে পড়ে ছিল দুই যুবকের নিথর রক্তাক্ত দেহ।

আবারও অশান্ত হয়ে উঠছে, বীর চট্টলা। দখল, চাঁদাবাজি, খুন— সবই চলছে। একের পর এক সন্ত্রাসী ধরা পড়লেও হঠাৎ কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আর এসবের নেতৃত্বে রয়েছে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তারা এখন নিজেদের দল ভারী করতে, মরিয়া হয়ে উঠেছে। দলে টেনে আনছে দাগি আসামিদের। তবে এসব প্রকাশ্যে না হলেও পরোক্ষই চলছে। ছত্রছায়া নাম উঠে আসছে বিএনপি কিংবা জামায়াতের।

অনুসন্ধান বলছে, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের প্রশ্রয়ে থাকায় এসব সন্ত্রাসীদের নিয়ে চিন্তিত খোদ নগর পুলিশও। তথ্যসূত্র বলছে, পুরনো সন্ত্রাসীদের অনেকেরই মামলা প্রায় শূন্যের ঘরে। অনেকে সাজা খেটে বের হয়েছে ৫ আগস্টের পরপরই। মামলায় খালাস কিংবা সাজা শেষ হওয়ার পরও অনেকে জীবন বাঁচাতে কৌশলে কারাগারে পড়ে ছিল। কারাগারে নিজেদের নিরাপদ মনে করে সেখানে থাকার জন্য শোন এরেস্ট দেখাতে নতুন নতুন মামলায় নিজেদের নাম বসাতেও বিপুল টাকা খরচ করছিল অনেক সন্ত্রাসী।

অনুসন্ধান বলছে, চট্টগ্রামে ফিল্মি স্টাইলে জোড়া খুনের নেপথ্যে অন্ধকার জগতের খেলা। শনিবার (২৯ মার্চ) নগরে রাতের আঁধারে ফিল্মি স্টাইলে জোড়া খুনের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে মাঠে নামে টিম আলোকিত চট্টগ্রাম।

স্থানীয় সূত্র বলছে, শনিবার রাত পৌনে ৩টায় চকবাজার থানা এলাকার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা সড়কের চন্দনপুরা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে সেই বিষয়ে প্রশাসন এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানায়নি গণমাধ্যমকে।

সূত্র বলছে, নিহত আবদুল্লাহ ও মানিকের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। নিহত মানিকের বাড়ি হাটহাজারীর মদুনাঘাটে। মানিক পেশায় গাড়িচালক। তবে আবদুল্লাহ ছিল সরোয়ারের গ্রুপের বিশ্বস্তই।

পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র বলছে, নগরের বাকলিয়ার কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু থেকে, বাকলিয়া এক্সেস রোড অভিমুখী, চট্টমেট্রো-গ ১২-৯০৬৮ নম্বরের একটি রূপালী রঙের প্রাইভেট কারকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে হঠাৎ ধাওয়া করতে থাকে ৪-৫টি মোটরসাইকেলে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে অনবরত গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে প্রাইভেটকারটিকে ধাওয়া করে। এসময় প্রাইভেট কারের ভেতর থেকেও, মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়।

মোটরসাইকেল আরোহীদের হাতে অস্ত্র ছিল বেশি এবং সবার মাথায় ছিল হেলমেট। গাড়ির বিভিন্ন অংশ গুলিতে ফুটো হয়ে যায়।তবে আলোকিত চট্টগ্রামের অনুসন্ধান বলছে, সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিল পার্লারের সূচির জামাই ইকরাম। মূলত শনিবার গভীর রাতে সন্ত্রাসী সরোয়ার ও ইকরাম বালুর মহালে থাকলেও লোকজন বেশি থাকায় গাড়িতে স্পেস হবে না ভেবেই আগেভাগেই চলে যায়। সরোয়ারের লোকজন বলছেন, এই খুনের ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে দুবাইয়ে পালিয়ে থাকা সাজ্জাদ খান ওরফে এইট মার্ডারের সাজ্জাদ। স্থানীয় সূত্র বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ছিল বিদেশে পালিয়ে থাকা সাজ্জাদ খানের সেকেন্ড ইন কমান্ড। সাজ্জাদ খান শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।

অনুসন্ধান বলছে, ইকরামের বাড়ি চট্টগ্রামের মুরাদপুরের হাসিনা মঞ্জিলে। মেহেদীবাগ এলাকার পার্লারের সূচিকে বিয়ে করে মুরাদপুরের ছেলে ইকরাম। সূচির সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে। সূচির জামাই ইকরাম মূলত বিএনপিপন্থী শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার সহযোগী। ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের সময় ইকরাম ও সূচি ঘটনাস্থল বসুন্ধরা শপিং মলেই ছিলেন। ভিডিওতেও তাদের দেখা গেছে। এরপর থেকে সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না ও একরামের স্ত্রী সূচি একে অপরকে নানা উক্তি ছুঁড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে।

এদিকে সিএমপির পাঁচলাইশ থানায় চাঁদাবাজি মামলা ঠুকে দেন, ইকরামের স্ত্রী রুমা আক্তার স্মৃতি। চাঁদাবাজি মামলায় আসামি করা হয় গ্রেপ্তার হওয়া ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, সাজ্জাদ খান প্রকাশ এইট মার্ডারের সাজ্জাদ, শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিব খান, রায়হান, মো. হেলাল, মো. হাসান, আরমান ওরফে ডবল হাজারী, মো. ইমন, বোরহান, রাজু, মোহাম্মদ ও দিদারকে। অনুসন্ধান বলছে, রুমা আক্তার স্মৃতি আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত সূচি নামে।

সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিল সূচির স্বামী ইকরাম। ওই সময় সরোয়ার ও ইকরাম চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানার, শাহ আমানত সেতু বালুর মহালে ছিল। এই বালুর মহাল নিয়েও ছিল বেশ দ্বন্দ্ব। সন্ত্রাসীদের কাছে খবর ছিল একসময়ে নগরীর আতঙ্ক সরোয়ার বাবলা ও তাঁর সহযোগী ইকরাম বালুর মহালেই অবস্থান করছিল। তবে ইকরাম গাড়িতে না উঠে আগেভাগেই চলে যান। কিন্তু মোটরসাইকেলে থাকা সন্ত্রাসীরা জানতেন না ওই গাড়িতেই ছিলেন সন্ত্রাসী সরোয়ার৷

অনুসন্ধান বলছে, শাহ আমানত সেতু বালুর মহাল থেকে গভীর রাতে প্রাইভেট কারে রওনা হন সরোয়ারসহ আরও পাঁচ যুবক। গাড়ি চালাচ্ছিলেন নিহত মানিক। নিহত আব্দুল্লাহ ছিল প্রাইভেট কারের পেছনের সিটে। বালুর মহাল থেকে রওনার হওয়ার পরপরই চলন্ত গাড়ি ঘিরে চলতে থাকে পাঁচটি মোটরসাইকেল। প্রতিটি বাইকে ছিল হেলমেট পড়া দুযুবক। তারা এতটাই অস্ত্র বহন করছিল শত শত রাউন্ড গুলি ছুঁড়েও শেষ হচ্ছিল না গুলির শব্দ। কারের গ্লাস ছিদ্র করে ভেতরে গুলি ঢুকতে থাকে। একপর্যায়ে গুলি লাগে নিহত যুবক আব্দুল্লার ঘাড়ে।  পরিস্থিতি বেগতিক দেখেকারটি বহদ্দারহাটের দিকে না গিয়ে, ঢুকে পড়ে বাকলিয়ার নতুন সড়ক এক্সেস রোডের দিকে। এরপরও থামছিল না সন্ত্রাসীদের গুলি। সরোয়াররা এসময় সড়কে কতর্ব্যরত পুলিশের টহল টিম খুঁজছিল। পুলিশের টহল টিম পাওয়ার মুহূর্তেই গুলি লাগে গাড়ি চালক নিহত মানিকের গায়ে।

আলোকিত চট্টগ্রামের হাতে আসা সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়, বাকলিয়া এক্সেস রোডের চন্দনপুরা এলাকায়, টহল পুলিশের কাছাকাছি প্রাইভেট কার পৌঁছলে সরোয়াররা দৌড়ে একটি কুলিং কর্ণারে ঢুকে পড়েন। এসময়ও গুলি ছুঁড়তে থাকে সন্ত্রাসীরা। দৌড়ানোর সময় দুই যুবকের হাতে ও পায়ে গুলি লাগে। ফুটেজে সরোয়ারকে হতভম্ব হতেও দেখা যায়। পায়ে গুলিবিদ্ধ যুবক কুলিং কর্ণারে লুটিয়ে পড়েন। এরপরও থামছিল না সন্ত্রাসীদের গুলি৷

তবে আব্দুল্লার বোন বলছেন,  এর আগেও নিহত আব্দুল্লা সন্ত্রাসী সরোয়ারকে বাঁচাতে গিয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। এতদিন অসুস্থ হয়ে ছিল বাসায়। কারাগারে থাকা ছোট সাজ্জাদ ওইসময়ও আব্দুল্লাকে গুলি করেছিল।

নতুন ব্রিজ এলাকার বালুর মহালটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়ন্ত্রণ করতেন নুররাত ডেভেলপারের নাজিম। নাজিমের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। তবে স্থানীয়রা বলছেন, নাজিমকে বালুর মহাল নিয়ন্ত্রণে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করতেন পটিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান শফিক।

যোগাযোগ করা হলে চকবাজার থানার ওসি জাহেদুল কবির আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, মোটরসাইকেল থেকে ছোঁড়া গুলির একপর্যায়ে এক্সেস রোডের চন্দনপুরায়, এসে প্রাইভেটকারটি থামে। এসময় গাড়িতে থাকা আরোহীদের মধ্যে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এবং দুজন আহত হন।

ওসি বলেন, ঘটনাস্থলে এসে সিআইডির ক্রাইম সীন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। ঘটনার নেপথ্য কারণও অনুসন্ধানসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm