অপহরণের দুই দিনের মাথায় পটিয়ায় পাঁচ বছরের শিশু জায়হানের বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মুক্তিপণের দাবিতে রেখে যাওয়া একটি হাতের লেখা চিরকুটকে সূত্র ধরে অভিযান চালিয়ে ঘটনায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় পটিয়াজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভোরে পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়া এলাকার একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে শিশু জায়হানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়ে।
পুলিশ জানায়, মো. সাইফুদ্দীন (৩৯), শাহানুর আক্তার (৩৫) ও নিহা (১৮) নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহান এবং ওয়াসিফা নামে আরও দুইজনকে আটক করা হয়েছে।
নিহত জায়হান স্থানীয় গ্যারেজ মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলমের একমাত্র ছেলে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বেলা ১২টার দিকে বাড়ির সামনের রাস্তায় খেলতে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা ধারণা করেছিলেন, হয়ত পাশের পুকুরে পড়ে গেছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুকুরে তল্লাশি চালিয়েও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সন্ধ্যার দিকে পটিয়া থানায় জিডি করা হয়।
সেদিন শিশুটিকে খোঁজার একপর্যায়ে পরিবারের শয়নকক্ষের বিছানায় একটি হাতে লেখা চিরকুট পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল— তোর ছেলে আমাদের কাছে আছে। ছেলেকে পেতে চাইলে যা বলছি তা শুন। আধা ঘণ্টার মধ্যে ৩ লাখ টাকা এবং তোদের পরিবারের যেকোনো একজনের মোবাইল আনলক করে একটি ব্যাগে ভরে বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে ভাঙা দোকানের ভেতরে রেখে দিবি।
চিরকুটটি পাওয়ার পরই অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত হয় পরিবার। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সেটি আলামত হিসেবে সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিরকুটের হাতের লেখা, স্থানীয় তথ্য এবং প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে অভিযান চালিয়ে শিশু জায়হানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মুক্তিপণের টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করা হয়েছিল। তবে ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে খুন করা হয়।
জায়হানের স্বজনরা জানান, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত প্রতিবেশীরাই পরিবারের সঙ্গে শিশু জায়হানকে খোঁজার নাটক করছিল। তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে খোঁজাখুঁজিতেও অংশ নেয়।
নিহতের এক স্বজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা ভাবতেই পারিনি যারা আমাদের সঙ্গে সারারাত জায়হানকে খুঁজেছে, তারাই ওকে মেরে ফেলেছে। টাকার জন্য একটা নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে খুন করবে, এটা কোনো মানুষ করতে পারে না। আমরা তাদের ফাঁসি চাই।
জানতে চাইলে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বৃহস্পতিবার ভোরে পটিয়া থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযানে শিশুটির বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ, খুনের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে জায়হানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শত শত মানুষ তার বাড়িতে ভিড় করেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা। আর নির্বাক বসে আছেন বাবা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এ ধরনের নির্মম ঘটনা পটিয়ার ইতিহাসে বিরল। শিশু হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অপরদিকে নিহত শিশুর স্বজনরা জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি পটিয়া থানার সামনে এসে শেষ হয়।
জায়হানের মামা বলেন, আমরা কোনো সান্ত্বনা চাই না, আমরা বিচার চাই। যারা আমাদের শিশুকে খুন করেছে তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে হবে, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়।
আলোকিত চট্টগ্রাম
