শিল্পজোন আনোয়ারায় ‘ধর্ষণ’ আতঙ্ক

শিল্পজোন হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা। এ উপজেলার বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত রয়েছেন হাজার হাজার নারী শ্রমিক। এসব নারী শ্রমিকের জন্য এখন আতঙ্কের এক নাম ‘ধর্ষণ’।

আনোয়ারা থানা সূত্রে জানা গেছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের চেষ্টার গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে এখনে ১১টি মামলা হয়েছে।

৬ জানুয়ারি বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে উপজেলার বারশত ইউনিয়নের সিইউএফএল হাউজিং কলোনীতে এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়। মামলার পর গ্রেপ্তার করা হয় মো. রিমন হোসেন (২৮) নামে সিইউএফএলের এক কর্মচারীকে।

২ মার্চ আনোয়ারা থানার দক্ষিণ শোলকাটা লাবিবা ক্লাবের পাশে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়। ধর্ষণের পর ওই নারীকে খুন করা হয়েছে, বলছে পুলিশ।

২৯ মে থেকে ৩১ মে  বটতলী এলাকায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৫) ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১ জুন মামলার পর গ্রেপ্তার করা হয় মো. কায়সার (২০) নামে এক চায়ের দোকানের কর্মচারীকে। গ্রেপ্তার কায়সারের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের সলিমাপাড়া এলাকায়।

এছাড়া গত ১৯ জুন কেইপিজেডে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে বাড়ি ফেরার সময় অটোরিকশায় এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হলে উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের বরৈয়া গ্রামের বাসিন্দা অটোরিকশা চালক ফোরকান (৩২) ও মো. হানিফকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় অটোরিকশার ভেতর তল্লাশি চালিয়ে ভুক্তভোগী তরুণীর একটি কানের দুল উদ্ধার করা হয় বলে জানায় পুলিশ।

২৬ জুন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে আনোয়ারা থেকে বোয়ালখালীতে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে বোয়ালখালীর কালুরঘাট আমতল নবাব আলী চৌধুরী বাড়ির একটি ভাড়া বাসা থেকে অভিযুক্ত মো. বাবুকে (২৬) গ্রেপ্তার এবং ওই কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়।

এদিকে জুঁইদন্ডী ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের মামলায় ৮ জুলাই বাবু (৩৫) নামে আরও একজন গ্রেপ্তার হন। ২৩ জুন দুপুর ২টার দিকে নিজ বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন ওই কিশোরী। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর থানায় অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ বাবুকে গ্রেপ্তার করে।

এছাড়া ৪ ও ৫ আগস্ট চাকরির প্রলোভনে বারশত বোয়ালিয়া ঈদগাঁর পাশে দুই দফায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরে ৬ আগস্ট মামলা হলে পুলিশ এনামুল হক প্রকাশ রিপন, সাইফুদ্দিন ও কাশেমকে গ্রেপ্তার করে।

সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট বটতলী ইউনিয়নে নিজ ঘর থেকে অপহরণ করা হয় এক কিশোরীকে। পরে তাকে পশ্চিম বরৈয়া ডিউরি রাস্তার মাথায় বিলের পাশে বাউন্ডারী ওয়ালের পরিত্যক্ত টিনশেড ঘরে ১০ ঘণ্টা আটকে রেখে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় এক নারীসহ ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া আরো তিনটি ধর্ষণচেষ্টার মামলা আনোয়ারা থানায় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়া এক কিশোরী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, পরিবারের অভাব দূর করতে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থেকে আনোয়ারার কেইপিজেডে যাই চাকরির সন্ধানে। সেখানে এক অমানুষের খপ্পরে পড়ে আমাকে ইজ্জত হারাতে হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ওডেব’র (অর্গানাইজেশন ফর ওমেন্স ডেভেলাপমেন্ট ইন বাংলাদেশ) এরিয়া অফিসার মো. মাহমুদুল হক আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু এ সময়ে হ্যারাসমেন্টও বেড়েছে। শিল্প উপজেলা আনোয়ারায় দিন দিন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও নারীদের নিরাপত্তা কমছে। নিরাপত্তার এ দিকটিতে প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

জাতীয় মহিলা সংস্থা আনোয়ারা উপজেলার প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, পত্রিকায় যখন এই বিষয়গুলো দেখি খুব খারাপ লাগে। এসব ঘটনার যদি সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যায় তবে নারীর প্রতি সহিংসতা কমে আসবে।

একই প্রসেঙ্গে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিরিন ইসলাম বলেন, আনোয়ারা চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা। এখানে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি ঘটনা খুব স্পর্শকাতর। প্রশাসন এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো আগে ধামাচাপা দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের তৎপরতার কারণে এখন আর সেই সুযোগ নেই।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনির হোসেন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গত ৮ মাসে ১১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযোগ বা তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে এমন অপরাধ থেকে পরিত্রাণ পেতে সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করেন ওসি মনির হোসেন।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm