জসিম উদ্দিন আহমদ (সিআইপি) মসজিদের উন্নয়নে পাঁচ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন জানিয়ে কয়েকদিন আগে ফেসবুকে পোস্ট করেন চন্দনাইশ উপজেলার এক ব্যক্তি। কিন্তু হঠাৎ উধাও হয়ে যায় সেই পোস্ট। কেন পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হলো এ নিয়ে এলাকায় দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
জানা যায়, নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী করা যায় না। কিন্তু বড় ঋণের বোঝা ও গ্রেপ্তারি হুলিয়া নিয়ে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সেই জসিম উদ্দিন আহমেদ (সিআইপি)। প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে দিচ্ছেন অনুদানও।
এদিকে তাঁর এসব কাজের খবর জেনে আদালতের শরণাপন্ন হন পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফার্মাস ব্যাংক) কর্তৃপক্ষ। উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে টানতে ঋণখেলাপি জসিম উদ্দিন দুহাতে টাকা উড়ালেও পরিশোধ করছেন না ব্যাংকের পাওনা টাকা।
গত ৩০ এপ্রিল জসিমসহ তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। ২১ মে’র মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন আদালত। তবে তিনি জনসম্মুখে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাকে গ্রেপ্তার করেনি থানা পুলিশ। ফলে জসিমের বিরুদ্ধে ফের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে পদ্মা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২৬ মে) ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জসিমকে গ্রেপ্তার করতে ফের নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাহিদুর রহমান।
আরও পড়ুন : অনেক ব্যবসায়ীকে নিঃস্ব করেছেন শিল্পপতি আব্দুল হাই, ফেঁসে গেলেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যানের মেয়েও
বিষয়টি নিশ্চিত করে আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার না করা আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেছেন আদালত। জসিম উদ্দিন আহমদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করার জন্য চন্দনাইশ থানার ওসিকে ফের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ আদেশ চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার ও ডিআইজিকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে জানতে জেসিকা গ্রুপের এমডি জসিম উদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, উচ্চ আদালতের ৬ মাসের স্থগিতাদেশ আছে। কপিটি আপনাকে পাঠাচ্ছি। সোমবার (২৭ মে) সকালে অর্থঋণ আদালতে অর্ডারটি নিয়ে যাবো। পনেরো কোটি টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে দিয়ে দিচ্ছি।
জানা যায়, জেসিকা গ্রুপের এমডি জসিম উদ্দিন আহমদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া বদুরপাড়ার মনির আহমেদ বাড়ির মফজল আহমদের ছেলে। চট্টগ্রাম নগরের মহল মার্কেট বন্ধকে রেখে ঋণ নেন তিনি। তাঁর নেওয়া ঋণের গ্যারান্টার ছিলেন স্ত্রী তানজিনা।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৪ জুলাই ব্যাংকের পক্ষে পদ্মা ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার সহকারী অফিসার মো. রাসেল পাটোয়ারি ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করেন। ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল অর্থঋণ আদালতের বিচারক মুজাহিদুর রহমান নগরের কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেন। জামানত দেওয়া লাভজনক প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ রিসিভার নিয়োগের পর বিবাদীরা ব্যাংকের সঙ্গে আপস-মীমাংসায় যান। সেসময় জসিম উদ্দিন ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। এসময় ব্যাংকের পাওনা ছিল ১১৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার ২১০ টাকা। এ ঋণের সুদ মওকুফ করে ৬০ কোটি টাকা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয় জসিমকে। বাকি ৩৫ কোটি টাকা নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে পরিশোধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিমাসে এক কোটি টাকা করে পরিশোধের অঙ্গীকারও করেন জসিম। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।
এদিকে ঋণ পরিশোধ না করায় চলতি বছরের ২৭ মার্চ তার বন্ধকি সম্পত্তি নিলামের দিন ধার্য করেন আদালত। সেদিন জসিম উদ্দিন আদালতে উপস্থিত হয়ে ৩ কোটি টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারে নিলাম স্থগিতের আবেদন করলেও কোনো টাকা পরিশোধ করেননি। সেদিন বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রয়ের দরপত্র না পাওয়ায় নিলাম স্থগিত করা হয়। এরপর ব্যাংকের পক্ষে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আবেদন করলে একদিনের মধ্যে ৬ কোটি টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করেন জসিম উদ্দিন আহমদ। তবে ২৮ মার্চ কেবল ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন তিনি।
অন্যদিকে প্রতিমাসে এক কোটি টাকা করে পরিশাধ না করায় ১৩ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে যায় তাঁর। গত ৪ এপ্রিলের মধ্যে সেই টাকা পরিশোধ না করায় সস্ত্রীক জসিমকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। ২৯ এপ্রিল ব্যাংকের পক্ষে সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন জানানো হয়। আদালত তা মঞ্জুর করে সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, জমিস উদ্দিনের মালিকানাধীন দুটি গাড়ি, দক্ষিণ খুলশীর জসিম হিল পার্ক, পাথরঘাটা এলাকায় ছয়তলা ভবন ‘মফজল টাওয়ার’ ও চন্দনাইশ এলাকার একটি ডুপ্লেক্স ভবন ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর ৩০ এপ্রিল ১২ কোটি টাকা পরিশোধের দিন ধার্য থাকলেও জসিম উদ্দিন সেদিন কোনো টাকাই পরিশোধ করেননি। ওইদিন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। বর্তমানে জসিমের কাছে ১১৮ কোটি টাকার বেশি পাবে পদ্মা ব্যাংক।
আরএস/আরবি


