চট্টগ্রামজুড়ে মশার যন্ত্রণা

চট্টগ্রাম নগরে বেড়েছে মশার উপদ্রব। মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ নগরবাসী। মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি টাঙিয়ে, না হয় কয়েল জ্বালিয়ে কিংবা স্প্রে ছিটিয়ে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। নগরজুড়ে মশার উৎপাত বাড়লেও নিধনে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক)। এছাড়া অভিযোগ আছে, চসিক ওষুধ ছিটালেও মরে না মশা, শুধু মেলে ঘণ্টাখানেকের স্বস্তি।

এদিকে মশার কয়েলের কারণে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, ফুসফুস, কিডনির রোগসহ বিভিন্ন রোগের বিপদ বাড়ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস আলোকিত চট্টগ্রাম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কয়েল ব্যবহারের ফলে শরীরের শ্বাসনালীর প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, কিডনির রোগসহ ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কেউ যদি কয়েল খেয়ে ফেলে তাহলে খাদ্যনালীর ক্ষত, রক্তক্ষরণ ও লিভারের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মশার উপদ্রবের মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হয়ে ভর্তি হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে। একইসঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। তবে চসিক বলছে মশা বাড়লেও ডেঙ্গু রোগী কমছে। মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম অব্যাহত আছে। ফগার মেশিনের ধোঁয়া শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য ক্ষতিকর নয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২ জন। এদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১১ জন, নারী ১১ জন ও শিশু ৮ জন।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ৫ দিন পর ডেঙ্গুতে সুখবর

চলতি বছর মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ৭৪৯ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৯ জন পুরুষ, ১ হাজার ৪৮ জন নারী ও ৬৯২ জন শিশু। মোট আক্রান্তের ২ হাজার ৪২৯ জন নগরের বাসিন্দা এবং ১ হাজার ৩২০ জন উপজেলার বাসিন্দা। শুধু চলতি নভেম্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৮১৪ জন। গত অক্টোবরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ৪৩০ জন।

এদিকে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নভেম্বরের ১৮ দিনেই প্রাণ গেছে ১৪ জনের। এর আগে অক্টোবরে ৯ জন, সেপ্টেম্বরে ১১ জন এবং জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছিল ৫ জনের। মারা যাওয়াদের মধ্যে ২০ জন নারী, ১৫ জন পুরুষ ও ৫ জন শিশু।

নগরবাসী বলছেন, দিনের বেলায় সহনীয় থাকলেও বিশেষ করে বিকেল ৫টা থেকে বাড়তে থাকে মশার উৎপাত। তখন মশারি ও কয়েল ব্যবহার বাধ্যতামূলক ব্যবহার করতে হয়। অনেকে কয়েলের ধোঁয়া সহ্য করতে না পেরে ঘরে দিন-রাত মশারি টাঙিয়ে রাখেন। এছাড়া মশার কারণে রাতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও নেতিবাচক মন্তব্য পোস্ট করেছেন।

ফেসবুকে বাবুজিত দাশ নামে একজন লেখেন, পৃথিবীতে একমাত্র সাহসী প্রাণী হচ্ছে মশা। যার মৃত্যুভয় নেই, নেই কোনো পিছুটান।

১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুজিত দাশ বলেন, দিন-রাত মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। নিয়মিত নেবুলাইজ করতে হয়। তাই ঘরে কয়েল জ্বালাতে পারি না। সারাক্ষণ মশারি টাঙিয়ে ভেতরে থাকতে হয়। মশা তাড়াতে মেশিনে দেওয়া ধোঁয়াগুলোতে আমার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন : ডেঙ্গু কেড়ে নিল ফারুক—শাবানার প্রাণ

এদিকে মশার ওষুধ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আছে অনেক নগরবাসী। কারো অভিযোগ, এলাকায় ওষুধ ছিটাতে কখনও কাউকে দেখেননি। আবার কারো অভিযোগ, ওষুধ ছিটালেও মশার কামড় থেকে মুক্তি মিলছে না।

৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওমর আলী মাতব্বর লেনের বাসিন্দা মো. আকমল হোসেন বলেন, সন্ধ্যা থেকে মশার উৎপাত বেড়ে যায়। ঘরে-বাইরে কোথাও কামড় থেকে রক্ষা নেই। সিটি করপোরেশন ওষুধ ছিটালেও সেগুলোতে মশা মরে না। আমাদের এদিকে ওষুধ ছিটাতে এখনও চোখে পড়েনি।

একই এলাকার গৃহিণী রিয়া দে বলেন, মশার কামড়ে সন্ধ্যায় ছেলেমেয়েরা টেবিলে বসে পড়ালেখা করতে পারে না। ক্ষতির কথা ভেবে কয়েলও জ্বালাতে পারি না। বাধ্য হয়ে মশারি টাঙিয়ে বসাতে হয়।

১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. রাজ্জাক বলেন, মশার কয়েল, স্প্রে কিংবা মশা মারার ব্যাট অনেককিছু ব্যবহারকরেও মশার কামড় থেকে মুক্তি মিলছে না। শুরুতে একবার সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ধোঁয়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘণ্টাখানের স্বস্তির পর, আবার শুরু হয় উৎপাত। মশার কামড় থেকে মুক্তি চাই আমরা।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, মশার উপদ্রব বেড়েছে ঠিক। তবে সম্প্রতি আমাদের সঙ্গে নতুন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মহোদয়ের বৈঠক হয়েছে। এরপর থেকে মশার ওষুধ ছিটানো কার্যক্রম আরও জোরদার হয়েছে। আশা করছি মশার উপদ্রব কমে আসবে। তাছাড়া এখন বৃষ্টি নেই। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি চসিকে। তবে নগরবাসীকে সচেতন ও সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিজের আঙ্গিনা ও চারপাশ সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যাতে মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে ভীতি ছড়াচ্ছে নভেম্বর

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম (মাহি) মশার উপদ্রব বাড়ার কথা স্বীকার করে আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়েনি, এখন নিম্নমুখী। আমরা জুলাই মাসে যে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করেছিলাম সেটা এখনও চলমান আছে। এছাড়া সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা পর্যবেক্ষণ করে সেই ঠিকানায় ওষুধ পাঠানো এবং রোগী যে এলাকায় বেশি সেই এলাকায় এক্সট্রা জোর দেওয়া হচ্ছে।

চসিকের ওষুধে মশা মরে না, নগরবাসীর এমন অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা আমরা জানি না। আমরা মশার ওষুধ আইডিসিআর প্রতিষ্ঠান থেকে টেস্ট করিয়ে পরে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পর প্রয়োগ করি। পরিবেশ ও মানুষের যাতে ক্ষতি না হয় সেভাবেই ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে ছিটানো হচ্ছে নিয়মিত। যদি বেশি মাত্রায় ডোজ নির্ধারণ করে ওষুধ মারা হতো তাহলে সাথে সাথে মশা মারা যেত এবং সেটি ক্ষতিও হতো।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে এলাকা ও ওয়ার্ডগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে রুটিন আকারে ক্রাশ প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫-৭ জন লোক মশা নিধনে নিয়মিত কাজ করছে। এখন ৪১টি ওয়ার্ডে প্রায় ২৫০ জন লোক মশার ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত আছে।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm