‘হঠাৎ নত সিডিএ’—চকবাজার টু বহদ্দারহাট সড়ক দাবিয়ে বুক ফুলিয়ে বানাচ্ছে হাইরাইজ বিল্ডিং     

কাপাসগোলার ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’ মালিকের দাপটে অসহায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সিডিএর পাঠানো নোটিশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিন-রাত সমানতালে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ভবন মালিক মো. বদিউল আলম।

গত ২ জানুয়ারি ‘হাইরাইজ বিল্ডিং’র নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে নকশা জমা দিতে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-১ এর দপ্তর থেকে নোটিশ দেওয়া হয় ভবন মালিককে। কিন্তু এরপরও বন্ধ হয়নি কাজ। শুধু দিনে নয়, রাতেও চলছে কাজ।

এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত চট্টগ্রামে ‘হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে’ তলিয়ে যাচ্ছে চকবাজার টু বহদ্দারহাট সড়ক, জেগে ঘুমাচ্ছে চসিক—সিডিএ শীর্ষক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ে সিডিএর। কাজ বন্ধে ভবন মালিককে পাঠানো হয় নোটিশ।

আরও পড়ুন: ‘হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে’ তলিয়ে যাচ্ছে চকবাজার টু বহদ্দারহাট সড়ক, জেগে ঘুমাচ্ছে চসিক—সিডিএ

অভিযোগ উঠেছে সিডিএর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ভবন মালিক নির্বিঘ্নে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনটির কাজ করতে গিয়ে চকবাজার থেকে বহদ্দারহাট সড়কের প্রায় ৪ ফুট অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে। দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল। পরিস্থিতি এমন, যেকোনো সময় ভয়াবহ বিপদ ঘটতে পারে নগরের কাপাসগোলা এলাকায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিডিএর নোটিশকে পাত্তাই দেননি ভবন মালিক। প্রতিদিন চলছে কাজ। সিডিএ পরিদর্শক টিম আসার খবর আগেই চলে আসে ভবন মালিকের কাছে। তখন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলে যাওয়ার পর আবার শুরু হয় কাজ। রাতেও কাজ চলে সমানতালে।

নগরের ব্যস্ততম চকবাজার-বহদ্দারহাট কাপাসগোলা সড়কের তেলিপট্টি মোড় সংলগ্ন আবাসিক হোটেল স্টার পার্ক। এর পাশেই রাস্তার ধারে সিডিএর নীতিমালা অমান্য করে চলছে ব্যক্তি মালিকানাধীন বহুতল ভবনের কাজ। কাজের সুবিধার্থে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় ১৫ ফুট নালা কেটে সেখানে পানির পাইপ সংযুক্ত করে ভবন কর্তৃপক্ষ। অবৈধভাবে নালা কাটার কারণে প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রশস্ত রাস্তা দেবে যায়।

রাস্তা দেবে যাওয়ার ফলে সরু হয়ে গেছে সড়ক। সাধারণ পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে ওই সড়কে চলাচল করছেন প্রতিনিয়ত। আবার ঝুঁকি নিশ্চিত জেনেও দেবে যাওয়া সড়কে প্রতিদিন যাতায়াত করছে বাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন যানবাহন।

আলোকিত চট্টগ্রামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাতারাতি সড়ক থেকে বালুর বস্তা সরিয়ে বালু ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে সড়কটি দিয়ে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রী ও সাধারণ পথচারীরা।

জানা গেছে, ভবন মালিক বদিউল আলম  সিডিএ নীতিমালা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে নালা কাটার কারণেই প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং প্রায় ৫ ফুট প্রশস্থের রাস্তা দেবে গেছে। এছাড়া দেবে যাওয়া সড়ক কৌশলে দখলে নেওয়ার কারণে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: সপ্তাহ না যেতেই পুরনো রূপে নতুন সড়ক

তবে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জনদুর্ভোগের কারণ হিসেবে দায়ী করছেন সিডিএকে । এ ঘটনায় কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নগরের গুরুত্বপূর্ণ চকবাজার থেকে বহদ্দারহাট সড়কে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে নির্মাণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এতে সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই।

স্থানীয়রা জানান, ভবন মালিক অবৈধভাবে নালা কাটার কারণে সড়ক দেবে গেছে। সরু সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ঝুঁকি নিয়ে সরু সড়কে হাঁটতে হচ্ছে পথচারীদের। এতে প্রাণহানির মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এলাকার সচেতন মহল।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চাইলে সিডিএর অথরাইজড অফিসার-১ মো. ইলিয়াছ মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে ইমারত পরিদর্শক খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

পরে সিডিএ ইমারত পরিদর্শক খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, নগরের কাপাসগোলা এলাকায় ‘হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের’ কাজে অতিরিক্ত মাটি কাটায় সড়কে কিছুটা ফাটল দেখা দিয়েছে। আমরা পরিদর্শন করে ভবন মালিককে নোটিশ পাঠিয়েছি কাজ বন্ধ রাখতে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভবন মালিকের ছেলে এরশাদ সবকিছু দেখাশোনা করছেন। আমরা তাদের কাজ বন্ধ রাখার জন্য নোটিশ দিয়েছি। এরপরও তারা কাজ চালিয়ে গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চকবাজার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর রুমকি সেন গুপ্ত আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, আল মারজান কনসালটেন্ট ও জায়গার মালিকরা অবৈধ নকশায় কাপাসগোলা সড়কের তেলিপট্টি মোড় সংলগ্ন আবাসিক হোটেল স্টার পার্কের লাগোয়া ব্যক্তি মালিকানাধীন বহুতল একটি ভবনের নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে ১০০ ফিট রাস্তা দেবে যায়। তারা কোনো ধরনের সেফটি ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আমি সিটি করপোরেশন ও সিডিএকে অবহিত করেছি। আমাদের সিটি করপোরেশনের ইঞ্জিনিয়ার দেবে যাওয়া সড়কটি পরিদর্শন করে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভবন মালিককে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা করলেও জরিমানার টাকা দেননি।  বড় কথা হচ্ছে, তাঁরা সরকারি দায়িত্বশীল দুটি দপ্তরকে পরোয়ায় করছেন না।

তিনি বলেন, চকবাজার ও বহদ্দারহাট একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এই সড়ক দিয়ে আমাদের সিটি মেয়র ও লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত। এখন দেবে যাওয়া সড়ক দিয়ে ঝুঁকি থাকা শর্তেও মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা রয়েছে। আমাদের কাজ হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভবন কর্তৃপক্ষকে কাজ বন্ধ রেখে ভবনের নকশা দেখানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এরপরও কাজ চালিয়ে গেলে জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করা হবে।

আরও পড়ুন: ১০ তলা বিল্ডিং উঠল ছাড়পত্র ছাড়াই, হঠাৎ ঘুম ভাঙল পরিবেশের

তিনি আরও বলেন, ভবন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি অপশক্তি হাত মিলিয়ে এসব করার সাহস পাচ্ছে। যাদের ইন্ধনে ভবন কর্তৃপক্ষ সাহস পাচ্ছে, শিগগির জনসম্মুখে তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। শেষ কথা হচ্ছে, আমাদের প্রধান কাজ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে চকবাজার ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কাজে সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। খবর পেয়ে আমি সিডিএকে বিষয়টি অবহিত করি। পরে তারা পরিদর্শনে আসেন এবং ভবন মালিককে কাজ বন্ধ রাখার নোটিশ পাঠিয়েছেন। বিষয়টি অবগত করে আমাকেও একটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নোটিশ পাওয়ার পরও তারা রাতের আঁধারে কাজ চালিয়ে আসছিল। প্রশাসনকে জানিয়ে কাজ বন্ধ করা হয়েছে। এলাকার জনগণের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য যতটুকু সম্ভব আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আরবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm