‘চোরের ১০ দিন’—চট্টগ্রামে পথে পথে সিটি করপোরেশনের গাড়ির তেল চুরি

চট্টগ্রামের পথে পথে সিটি করপোরেশনের গাড়ির তেল চুরি থামছে না। চালক-হেলপার ও চোরাই তেল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চলছে চুরির এই মহোৎসব। নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি থামিয়ে চুরি করা হচ্ছে তেল। পরে তা বিক্রি করে দেওয়া হয় বাজারে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে দুর্নীতির বড় জায়গা হচ্ছে তেল সেক্টর। সেখানে অকেজো গাড়ির জন্যও তেল বরাদ্দ নিয়ে চোরাই বাজারে বিক্রি করার নজির রয়েছে। এছাড়া দূরত্ব বেশি দেখিয়ে ও পেট্রোলপাম্পের মেশিনের কারসাজির মাধ্যমে অভিনব কায়দায় করা হয় তেল চুরি।

গত ১৭ আগস্ট বিকেল ৪টায় নগরের দেব পাহাড় এলাকায় সিটি করপোরেশনের একটি ময়লার গাড়ি (চেসিস নং-৭০০০০২৬) থেকে তেল নিতে দেখা যায় সবুজ শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে। তেল নেওয়া শেষ হলে ওই গাড়ি চলে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

আরও পড়ুন: সরকারি তেল বেচাকেনা স্পটেই র‌্যাব, ১৯০০ লিটার তেলসহ ৩ চোর ধরা

এর আগে ২০২০ সালের ৭ আগস্ট সিটি করপোরেশনের একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে তেল চুরির কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এ ঘটনায় হৈ চৈ পড়ে নগরজুড়ে। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসে চসিক।

পরদিন ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন তেল চুরির দায়ে অভিযুক্ত চালক কাজলচন্দ্র সেনকে বরখাস্ত করেন।

তেল চুরির ঘটনার পর জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও বিতরণ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ে নির্দেশনা দেন প্রশাসক সুজন। জ্বালানি তেল কেনা ও অনিয়ম রোধে তিন সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়। এছাড়া নিজস্ব ফিলিং স্টেশনের জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়াম থেকে ৬২ টাকায় প্রতি লিটার ডিজেল সংগ্রহের পরিবর্তে ৩ টাকা বেশিতে ৬৫ টাকায় হাক্কানি ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল কেনা হয়। কিন্তু এমন সিদ্ধান্তে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় চসিক প্রশাসককে।

অন্যদিকে গত ৫ এপ্রিল নগরের বন্দর থানার আনন্দবাজার মোড়ের শওকতের গ্যারেজে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় চোরাই তেলচক্রের দুই সদস্য মো. শাহাবুদ্দিন ও মো. শাহিনকে আটক করা হয়। জব্দ করা হয় তিন হাজার লিটার ডিজেল ও একটি ট্রাক।

এর আগে ২০০৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে নগরের পাহাড়তলী থানার পিসি রোড এলাকায় সিটি করপোরেশনের ট্রাক থেকে তেল চুরি করে বিক্রির সময় করপোরেশনের গাড়িচালক শাহ আলম ও আবদুর রাজ্জাক এবং চোরাই তেলের ক্রেতা দরবার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক জালাল আহমদকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় তেল চুরি ও বিক্রির অভিযোগে পাহাড়তলি থানায় মামলা হয়। এ মামলায় ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: পতেঙ্গায় ‘সরকারি তেল’ চোরা পথে যাচ্ছে দোকানে, ২ হাজার লিটার জব্দ

পরে ২০১৭ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মীর রুহুল আমিনের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যানবাহনের তেল চুরি করে বিক্রির দায়ে তিনজনের প্রত্যেককে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই রায়ে আদালত তাদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও দুই মাস কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

তবে এতকিছুর পরও থামেনি তেল চুরির মহোৎসব। চুরির সঙ্গে জড়িতরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছেন প্রতিদিন। তেল চুরি বন্ধে চসিককে আরও কঠোর হওয়ার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহিদুল আলম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, তেল চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে চালক-হেলপারসহ সংশ্লিষ্টদের বিবেক জাগ্রত না হলে তা রোধ করা কঠিন। প্রত্যেকে নিজের জায়গায় সৎ হলে তেল চুরিসহ সব অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে। তবে অন্যায় ও অনিয়কারীদের কখনো ছাড় দেওয়া হবে না। তেল চুরির সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক তাদের খুঁজে বের হবে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

আরবি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm