‘সরেজমিন’—রমজানের বাজারে রাতারাতি পাকছে কলা, বিষ খাচ্ছে গর্ভবতী মায়েরা

কলা বিভিন্ন গুণাগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল। এর পুষ্টিগুণও বেশ। এতে রয়েছে দৃঢ় টিস্যু গঠনকারী উপদান আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ। কলা ক্যালরির একটি ভালো উৎস। তবে প্রতিবছর রমজান এলেই বেড়ে যায় কলার চাহিদা। রমজানের বাড়তি দাম ধরতে কাঁচা কলা রাতারাতি পাকিয়ে ফেলা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিকে। এতে পুষ্টিকর কলাতেই বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি!

রাঙ্গুনিয়ার হাটবাজার ও পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন দোকানে দিনদুপুরে কার্বাইড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে দ্রুত সময়ে পাকানো হচ্ছে কলা। তবে এটি বন্ধে সংশ্লিষ্টদের নেই কোনো নজরদারি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কার্বাইড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের কারণে মাত্র ১২ ঘণ্টায় কলা সবুজ থেকে হলুদ রঙে পরিবর্তন হয়ে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় হয়ে উঠে। আর এসব কলা অজান্তে খেয়ে অনেকেই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। এভাবে কলায় বিষ ব্যবহারের একটি ভিডিও আলোকিত চট্টগ্রামের কাছে রয়েছে।

আরও পড়ুন: রমজানের প্রথম দিনেই জমজমাট—ইফতারির দাম বাড়লেও বিক্রি কমেনি

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, কেমিক্যাল মিশ্রিত কলা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব কলা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বমি ভাবসহ ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সবচেয়ে বেশি শঙ্কায় রয়েছে গর্ভবতী নারীরা। কারণ এসব কলা খেলে গর্ভজাত শিশু বিকলাঙ্গ হতে পারে। তাই কলা কেনার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, উপজেলার রাজানগরের রানীরহাট, ইসলামপুরের মঘাছড়ি, ধামাইরহাট, রাজারহাট, মোগলেরহাট, শান্তিনিকেন, মরিয়মনগর চৌমুহনী, পারুয়ার হাজারীহাট, বিয়ানবাজার, সরফভাটার বহুচক্র হাট, পোমরার শান্তিরহাট, বেতাগীর লাম্বুরহাট, ইছাখালী, রোয়াজারহাট, শিলক, কোদালা, পদুয়ার রাজারহাট, সোমবাজ্জ্যাহাটসহ উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯ ওয়ার্ডের দুই শতাধিক স্থানে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো কলা বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন। এসব কলা স্থানীয় হাট-বাজার ছাড়াও জেলা শহর হয়ে পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যান ঢাকার ব্যবসায়ীরাও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে বাগানে কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি কলার কাঁদিতে স্প্রে করা হয়। এরপর সেই কাঁদি কেটে সংরক্ষণ করা হয় আড়তে। পরে এসব কলা শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করে কার্বাইড জাতীয় রাসানিক পদার্থ মেশানো পানিতে ডুবানো হয়।। এসবের পরেই কলা সবুজ রঙ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে হলুদ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। আর কেমিক্যালে পাকানো এসব কলা যাতে পচে না যায় সেজন্য ব্যবহার করা হয় ফরমালিন। সরেজমিনে উপজেলার ১০টি পাইকারি কলার মোকাম ঘুরে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের রানীরহাট বাজারে গেলে প্রকাশ্যে খোরশেদ আলম নামের এক দোকানদারের কলায় রাসায়নিক বিষ দেওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। পরে গোপনে ওই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করা হয়। যা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: চারদিকে গন্ধ, সেখানেই তৈরি হচ্ছিল রমজানের সেমাই

কলায় বিষ ব্যবহারের বিষয়ে ব্যবসায়ী খোরশেদ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলাচাষ থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্তরে দেওয়া হয় কার্বাইড জাতীয় রাসায়নিক বিষ। বাগানে থাকা অবস্থায় করা হয় হরমন স্প্রে। অপরিণত কলা পাকাতে কেরোসিনের স্টোভে রাইপেন ও কার্বাইড জাতীয় রাসানিক পদার্থ দিয়ে দেওয়া হয় ধোঁয়া। স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে প্রফিট, মার্শাল, হিলডন, রাইজার, বাসুডিন, ইথিলিন, রাইপেনসহ নানা ধরনের ওষুধ ছিটানো হয় কাঁচা কলায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. সামিউল করিম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, কেমিক্যাল মিশিয়ে কলা পাকানো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব কলা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বমি ভাব ও ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

তিনি আরও বলেন, কার্বাইড জাতীয় কেমিক্যালের প্রভাবে গর্ভবতী নারীদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এমনকি গর্ভজাত শিশু বিকলাঙ্গও হতে পারে।

এসব বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফতেখার ইউনুসের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, কলায় রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো গুরুতর অপরাধ। এ কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মতিন/আরবি

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।

ksrm