চট্টগ্রামে তীব্র গরমের সঙ্গে হঠাৎ বেড়েছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া। এক ঘণ্টা পরপর চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। গত দুদিন ধরে বিদ্যুতের এমন ভেল্কিবাজিতে জনজীবনে বেড়েছে চরম ভোগান্তি। দিন-রাত সমানতালে চলছে বিদ্যুতের এমন লুকোচুরি। এ নিয়ে অনেকেই ক্ষোভ ঝাড়ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এদিকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নগরের বিভিন্ন বিপণি বিতানে করা হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। পুরো মার্কেটের পাশাপাশি সামনের রাস্তায়ও লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে। অথচ গতবছর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সারাদেশে সামাজিক অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, দোকানপাট, অফিস ও বাসাবাড়িতে আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। যদিও এবার তেমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ বিভাগও এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
![]()
পিডিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাওয়া যায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট। এ কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। এর মধ্যে শনিবার বিকেলে গ্রিড বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার সমস্যার সমাধান কবে হবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে বৃষ্টি হলে স্বাভাবিক হতে পারে বিদ্যুতের পরিস্থিতি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সাধারণত কোনো এলাকার তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেখানে মৃদু দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে বলে ধরা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেখানে মাঝারি দাবদাহ এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলে তীব্র দাবদাহ চলছে বলে ধরা হয়। আজ (রোববার) চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন শনিবার ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আরও পড়ুন: লোডশেডিংয়ের প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বেসরকারিতে কঠিন পরিস্থিতি
এর আগে শনিবার (১৫ এপ্রিল) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে হাটহাজারীতে গ্রিড বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া শুরু হয় বিভিন্ন এলাকায়।
জানা যায়, নগরের চকবাজার, বাকলিয়া, দেওয়ান বাজার, মুরাদপুর, প্রবর্তক, মেডিকেল, নাসিরাবাদ, জিইসি মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় শনিবার দুপুর ৩টা ২০ মিনিট থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এরপর থেকে প্রায় সারারাত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করতে থাকে। এ অবস্থা চলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এছাড়া অনেক এলাকা সারারাত ছিল বিদ্যুৎবিহীন। এলাকাবাসীকে কাটাতে হয়েছে নির্ঘুম রাত। এসময় ঘরে থাকা ছোট শিশুদের নিয়ে পড়তে হয় চরম বিপাকে।
এদিকে রোববার (১৬ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৫-৬ বার বিদ্যুৎ আসা যাওয়া করেছে। একবার গেলে ঘণ্টা বাদে আসছে বিদ্যুৎ। তীব্র গরমের সঙ্গে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চল বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে ১১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাওয়া যায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী-মদুনাঘাটের ১৩২ কেভি ট্রান্সফরমারে বিস্ফোরণের কারণে গ্রিড বিপর্যয় ঘটে। তবে সেই বিপর্যয় কাটিয়ে পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। এছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কিছু প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ। সেই কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সমাধানের চেষ্টা চলছে।
এদিকে বিদ্যুতের গ্রাহকরা বলছেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। গরমে ত্রাহি অবস্থা। এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দিন-রাত বিদ্যুৎ যায় আর আসে। ঘণ্টা ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাসা-বাড়ি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
নগরের পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা মো. সোহেল বলেন, শনিবার সকাল থেকে বিদ্যুতের আসা-যাওয়া শুরু হয়। এরপর বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত পর্যন্ত নয়-দশবার গেছে। বিকেলে একবার যাওয়ার পর আসে ইফতারের সময়। এছাড়া রোববার সকাল ৯ টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে ২ ঘণ্টা পর ১১টায়। ফলে অনেক এলাকায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে।
সঞ্জীব দে বাবু নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেন, রাত একটায়ও বিদ্যুৎ সাহেবের লুকোচুরি খেলা চলছে। বিদ্যুৎ সাহেবের উন্নতি আর হলো না, যা বলে সব যেন খাতা-কলমে।
জাহাঙ্গীর শুভ নামে আরেকজন লিখেন, প্রচণ্ড গরম আর কারেন্ট না থাকায় সীমাহীন কষ্ট। রাত-দিন ঘুমহীন। গরম আর লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ।
আবদুল হান্নান নামে একজন লিখেন, যেদিন গরম বেশি পরে সেদিন কারেন্ট বেশি যায়, কী ব্যাপার?
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা দীপক মিত্র বলেন, তীব্র গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় একেবারে ত্রাহি অবস্থা। একবার গেলে ঘণ্টাদেড়েক পর আসছে বিদ্যুৎ। শনিবার সারারাত এলাকার একটি অংশ ছিল বিদ্যুৎবিহীন। পরিবারের সবাইকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। পরদিন সকাল ১০টায়ও বিদ্যুৎ আসেনি। বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ জানিয়েও সুফল পাইনি।
![]()
নগরের মুরাদপুর বিবিরহাট এলাকার বাসিন্দা রুপন দাশ বলেন, অসহ্য গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সন্তানদের ঘুম ও পড়ালেখায় বিঘ্ন হচ্ছে।
এদিকে নগরের পাঁচলাইশ ও প্রবর্তক এলাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ ছোট-বড় অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও রোগ নিরুপণ কেন্দ্র রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বেকায়দায় পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো। এসময় বিঘ্নিত হয় সেবা।
আরও পড়ুন: একদিকে ইয়াস, অন্যদিকে লোডশেডিং—ভয় বাড়ছে কক্সবাজারে
নগরের ওমর আলী মাতব্বর লেইনের সৈয়দ টাওয়ারের কেয়ারটেকার মো. ওয়াজিউল্লাহ বলেন, হঠাৎ বিদ্যুতের কী হয়েছে কে জানে। শনিবার সকালে জেনারেটরে ৫০ লিটার তেল ঢুকিয়েছিলাম। সেই তেল রাতের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এরপর রোববার সকালে আবার ২০ লিটার তেল ঢুকালাম। রোববার সকাল ৯টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে ১১ টায়। এরপর বেলা সাড়ে ১২টায় গিয়ে আসে দেড়টার দিকে। এরপর আড়াইটার দিকে চলে যায়, আসে সাড়ে ৩টায়, আবার সাড়ে ৪টায় গিয়ে আসে সাড়ে ৫টায়। এভাবে এক ঘণ্টার পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে তিন লিটার তেল খরচ হয় জেনারেটরে। বিদ্যুতের এমন অবস্থা কবে ঠিক হবে কে জানে।
যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ ও বিতরণ বিভাগ-বাকলিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল হক আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বর্তমানে বিদ্যুতের ডিমান্ড অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী উৎপাদন বাড়েনি। শুধু বাকলিয়া নয়, সারাদেশে চাহিদা অনুযায়ী এখন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য অদল-বদল করে চালাতে হচ্ছে। এক ঘণ্টা এই এলাকায় বন্ধ রাখলে আরেক ঘণ্টা ওই এলাকা, এভাবে চলছে।
তিনি বলেন, আমার বিভাগে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৯৭ হাজার। সেই অনুযায়ী বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৩০-৩১ মেগাওয়াট। কিন্তু প্রতিদিন ওই অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যায়না। একেক সময় একেক রকম পায়। তবে এখন বৃষ্টির খুবই প্রয়োজন। আবহাওয়া ঠাণ্ডা হলে বিদ্যুতের অবস্থাও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বিভিন্ন মার্কেটে আলোসজ্জার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলোকসজ্জা না করার নির্দেশনা রয়েছে। এরপরও অনেক মার্কেটে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। এদিকে ঈদও সামনে চলে এসেছে। এখন কি আর করা।
আলোকিত চট্টগ্রাম


