ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর সাপ ‘রাসেলস ভাইপার’—কামড়ে এক দশকে ২৭২ জনের মৃত্যু

চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর ‘রাসেলস ভাইপার’ সাপ। গত দুই সপ্তাহে এ সাপের কামড়ে দুজনের মৃত্যু এবং ৯ জন অসুস্থ হয়েছেন রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলায়। এতে ওইসব এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে বাঘা পর্যন্ত পদ্মাপারে সাপটি এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পাবনার রূপপুর, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও মাদারীপুরের শিবচরে এ সাপ দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারনা,, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্যার পানিতে গঙ্গা হয়ে আবারও এ সাপ দেশে এসে বংশবিস্তার করছে। সাপের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে ফরিদপুরে ৭০ বিঘা কাশবন পরিষ্কার করা হয়েছে। দেশে ‘চন্দ্রবোড়া’ নামে পরিচিত সাপটি কিছুকাল আগেও বিলুপ্ত ছিল।

এক গবেষণায় দেখা যায়, গত ২০ বছরে ভারতে সাপের কামড়ে ১২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ ভাগ অর্থাৎ ছয় লাখ ভারতীয়ই মারা গেছেন রাসেলস ভাইপারের কামড়ে। বাংলাদেশে এ সংখ্যা ২৭২ জন।

আরও পড়ুন: ১২ ফুট লম্বা ‘অজগর সাপ’ ধরা পড়ল গরুর খামারে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রশিক্ষক বোরহান বিশ্বাস রোমন। তিনি রাজশাহীর পবা উপজেলায় একটি সাপ উদ্ধার ও পরিচর্যাকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। বোরহান বলেন, গত এক দশকে সারা দেশে ২৭২ জন রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মারা গেছেন।

জানা যায়, বিশ্বব্যাপী কিলিং মেশিন খ্যাত রাসেলস ভাইপার আক্রমণের ক্ষেত্রে এতই ক্ষিপ্র যে, ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ে এটি কাউকে কামড়ে আবার নিজ অবস্থানে ফেরত যেতে পারে।

এ সাপের কামড়ে শরীরের আক্রান্ত স্থানের টিস্যু নষ্ট হয়ে পচন শুরু হয় সঙ্গে সঙ্গে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে মৃত্যু অবধারিত। ধানক্ষেতে এ সাপ বেশি থাকায় কৃষকদের মাঠে কাজ করার সময় পায়ে গামবুট পরার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বোরহান বিশ্বাস রোমন আরও বলেন, গত ১৫ দিনে ২০৭টির মতো রাসেলস ভাইপার পিটিয়ে মারা হয়েছে। এই সময়ে রাসেলস ভাইপারের কামড়ের শিকার হয়েছেন ১১ জন।

আরও পড়ুন: ডুবজালে ‘বড়’ অজগর

তাদের মধ্যে মারা গেছেন দুজন। তিনি বলেন, এসব অঞ্চলে সাপটি বেশি থাকার অন্যতম কারণ, পদ্মার চরগুলো অনেক বড়। সেখানে রাসেলস ভাইপার সহজে বসবাস করতে পারে। খাদ্যও সহজলভ্য।

এ সাপের শরীরের রঙ এবং পাকা ধানগাছের পাতার রঙ একই। তাই রাসেলস ভাইপারেরও প্রিয় আবাসস্থল ধানক্ষেত। এরা শুষ্ক জায়গা পছন্দ করে। ধান পাকার কারণে ক্ষেত শুষ্ক থাকে। এছাড়া এ সময়ে ধানক্ষেতে ইঁদুর থাকে বলে সেখানে আস্তানা গড়ে সাপটি।

ফরিদপুর অঞ্চলে এ সাপটি ২০১৬ সালে প্রথম দেখা যায়। তখন থেকে বিষধর রাসেলস ভাইপারের দংশনে এ পর্যন্ত মারা গেছেন নারীসহ অন্তত ১০ জন। ধানক্ষেতের পাশাপাশি কাশবনেও বেশি দেখা যায় এ সাপ।

সম্প্রতি এ সাপের হাত থেকে রক্ষা পেতে চরাঞ্চলের প্রায় ৭০ বিঘা কাশবন যন্ত্রচালিত মেশিন দিয়ে পরিষ্কার করেন এক ব্যক্তি। ওই সময়ে মেশিনের আঘাতে কমপক্ষে ২৯টি সাপ মারা যায়।

আরও পড়ুন: গহীন বনের ‘মলুরাজ’ অজগর লোকালয়ে

চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ও ভেনম রিসার্চ সেন্টারের অন্যতম গবেষক ড. আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেন, রাসেলস ভাইপার অত্যন্ত বিপজ্জনক সাপ। দংশিত ৫০ শতাংশ মানুষই মারা যাচ্ছে। এর চিকিৎসাও জটিল। আমাদের দেশে যারা রাসেলস ভাইপারের দ্বারা দংশিত হচ্ছেন, তাদের অনেকের কিডনিও ফেল করছে। আর মাংস পচে যাওয়া এবং রক্তপাত বন্ধ না হওয়া তো আছেই।

তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে সব জাতের রাসেলস ভাইপারের বিষ সংগ্রহ করেছি। অ্যান্টিভেনমের (বিষের প্রতিষেধক) বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমরা এখনো এই সাপের জন্য অ্যান্টিভেনম দেশের বাইরে থেকে সংগ্রহ করি। সেটা আবার কখনো কখনো করে না। যাকেই এই সাপ কামড়াবে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপজেলা অথবা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।

এসি
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm