রঙ—তুলিতে সাজছে মা, করোনার ক্ষত সারাতে ব্যস্ত অমল সুজন সুশান্তরা

দুয়ারে কড়া নাড়ছে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই অনুষ্ঠিত হবে সনাতনীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ‘দুর্গাপূজা’। শেষ মুহূর্তে দেবী দুর্গাকে রাঙাতে রঙ-তুলিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। এ ব্যস্ততা শুধু প্রতিমা তৈরির নয়; অমল-সুজন-সুশান্তদের এ ব্যস্ততা করোনার ক্ষত সারানোরও!

সরেজমিন নগরের হাজারী লেইন, সদরঘাট, গোয়ালপাড়া, রাধামাধব আখেড়ার প্রতিমালয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠছে দেবী দুর্গা। একইসঙ্গে চলছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমার ফিনিশিং। নানা রঙে দৃষ্টিনন্দন সাজে সাজিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমাগুলোকে। উৎসুক অনেক দর্শনার্থী ভিড় করছেন এসব প্রতিমার তৈরির কারখানায়।

মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতিবছর বৈশাখ থেকে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রথমে খড় দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করে দেওয়া হয় মাটির প্রলেপ। তারপর শুকিয়ে করা হয় ফিনিশিং। এরপর দেওয়া হয় সাদা রঙ। সাদা রঙ শুকালে বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে তোলা হয় প্রতিমা।

আরও পড়ুন: দুর্গাপূজায় বাধা, হিন্দুদের হাজারো লোক ঘেরাও করল কৈবল্যধাম মন্দির

মৃৎশিল্পীরা আরও জানান, প্রতিমার ৯৫ ভাগ কাজ প্রায় শেষ। বাকি পাঁচ ভাগ কাজ তিন-চারদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। এরপর অর্ডার অনুযায়ী বুঝিয়ে দেওয়া হবে প্রতিমা। গতবছরের করোনার ক্ষতি এবার কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।

মৃৎশিল্পীরা অভিযোগ করেন, গতবছর করোনার কঠিন সময়ে কেউ তাদের পাশে দাঁড়াননি। ওই সময়টাকে ভীষণ কষ্টে কেটেছে তাদের জীবন।

পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ৬ অক্টোবর (বুধবার) শুভ মহালয়া। মহালয়ার দিন থেকে শুরু হয় পূজার ক্ষণগণনা। ১১ অক্টোবর (সোমবার) ষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে শুরু হবে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। ১৫ অক্টোবর (শুক্রবার) দশমীতে বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে পাঁচদিন ব্যাপী শারদীয় উৎসব।

নগরের সদরঘাটের স্বর্গীয় দুলাল পাল প্রতিমালয়ের স্বত্বাধিকারী সুজন ও সুশান্ত পাল আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, গতবছরের মতো এবারও শঙ্কা নিয়ে বৈশাখ মাস থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করি। প্রায় ৪০টির মতো প্রতিমার অর্ডার পেয়েছি। প্রতিমার কাজ বলতে গেলে শেষ পর্যায়ে। এখন শুধু প্রতিমাকে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে।

Thai Food

তাঁরা জানান, ৮ অক্টোবর থেকে প্রতিমা ডেলিভারি দেওয়া হবে পূজা কমিটিগুলোকে। বর্তমানে সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ে প্রতিমা বুঝিয়ে দিতে কারখানায় দিন-রাত কাজ করে চলেছেন ৭-৮ জন মৃৎশিল্পী।

আরও পড়ুন: মহানগর পূজা পরিষদের মাসব্যাপী চিকিৎসাসেবার উদ্বোধন

একই জায়গার লোকনাথ শিল্পালয়ের স্বত্বাধিকারী ও বিভাগীয় মৃৎশিল্পী মহাজোটের উপদেষ্টা অমল পাল আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, এবার ৩১টির মতো প্রতিমা তৈরি করেছি। সবগুলোই অর্ডার হয়ে গেছে। এর বাইরে কোনো অর্ডার নিইনি। প্রতিমার ৯৫ ভাগ কাজ শেষ। বাকি ৫ ভাগ কাজ আগামী তিন-চারদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, এবার লাভ তো দূরের কথা আগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টায় আছি। কারণ গতবছর করোনার কারণে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ সময় বাধ্য হয়ে কম দামে সব প্রতিমা বিক্রি করেছি। করোনাকালীন কঠিন সময়ে আমাদের খবর কেউ রাখেনি। আমার ছেলেকেও হারিয়েছি। বাপ-দাদার পেশা ছাড়তেও পারি না।

নটরাজ শিল্পালয়ের স্বত্বাধিকারী বাসুদেব পাল বলেন, পূজা কেমন হবে সে শঙ্কায় ২৫টির মতো প্রতিমা তৈরি করেছি। দু-একটি ছাড়া বাকি সব অর্ডার হয়েছে। গতবছর প্রতিমা তৈরি করে পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি মুখে পড়েছি। এবার সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি। গতবারের চেয়ে এবারের প্রতিমার দাম মোটামুটি ভালো পাচ্ছি।

রাধামাধব আখেড়ার স্বত্বাধিকারী তাপস পাল বলেন, পূজা একেবারেই সন্নিকটে। হাতে সময় খুব কম। তাই এখন দিন-রাত কাজ চলছে কারখানায়। আগামী তিন-চারদিনের সব কাজ শেষ করতে হবে। আশা করি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অর্ডার পাওয়া সব প্রতিমা পূজা কমিটিকে ডেলিভারি দিতে পারব।

এদিকে দুর্গাপূজা সামনে রেখে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে নগরের বিভিন্ন পূজা কমিটির। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে সাজসজ্জার কাজ। এবার নগরের ২৭৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান মহানগর পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল সেন উজ্জ্বল।

আলোকিত চট্টগ্রাম

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm