যে কারণে হালদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ডিম ছাড়েনি মা মাছ

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র ‘হালদা নদী’। বছরে একবারই উৎসব হয় এই হালদায়, যে সময়টাতে মা মাছ ডিম ছাড়ে। এবারও হালদায় ডিম ছেড়েছে মা মাছ। তবে উৎসবটা প্রতিবছরের মতো হয়নি। কারণ মা মাছ যে এবার প্রত্যাশা অনুযায়ী ডিম ছাড়েনি!

কেন এবার হালদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ডিম ছাড়েনি মা-মাছ? বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন এই প্রশ্নের উত্তর। তারা বলছেন— পূর্ণিমার তিথি থাকলেও এবার ছিল না মেঘের গর্জন, বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল। এ কারণে হালদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী ডিম ছাড়েনি মা মাছ।

তবে বিশেষজ্ঞদের এ কথার সঙ্গে একমত হতে পারেননি হালদার ডিম সংগ্রহকারীরা। তাদের মতে, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবেই এমনটা হয়েছে। এ কারণেই গতবছর যেখানে ২৫ হাজার কেজি ডিম আহরণ করা হয়েছিল, এবার তা এক তৃতীয়াংশেরও কম।

এদিকে অপর কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জোয়ারের পানি কর্ণফুলী হয়ে হালদায় প্রবেশ করায় এবার এমনটি হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হালদার পানিতে ৩৬ পিপিটি লবণ পাওয়া গেছে। এটির সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ১ পিপিটি। ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ এবং পূর্ণিমার প্রভাবে সমুদ্রের জোয়ারে লবণের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রাসন বেড়েছে। জোয়ারের পানি কর্ণফুলী হয়ে হালদায় ঢুকেছে। তাই এবার মা মাছ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডিম ছাড়তে পারেনি। তবে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে এবং পাহাড়ি ঢল নামলে এ সমস্যা কেটে যাবে।

বুধবার (২৬ মে) মধ্যরাত থেকে হালদা নদীতে ডিম ছাড়ে মা মাছ। ৩৪৩টি নৌকায় ৮০৬ জন সংগ্রহকারী ডিম সংগ্রহ করেন ভোররাত পর্যন্ত। সবমিলিয়ে আহরণ করা ডিমের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কেজি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বুধবার মধ্যরাত থেকে ডিম আহরণের নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদা নদীর আজিমের ঘাট এলাকায় ডিম সংগ্রহ করেছেন অনেকে। এছাড়া হালদার হাটহাজারী ও রাউজান অংশের রামদাশ মুন্সীর হাট, নাপিতের ঘাট, আমতুয়া, মাছুয়াঘোনা, পোড়াকপালি, কাগতিয়া, সিপাহির ঘাট, গড়দুয়ারা নয়াহাট, কেরামতলীর বাঁক ও অঙ্কুরিঘোনা এলাকায়ও চলেছে ডিম সংগ্রহের উৎসব।

৪০ বছর ধরে হালদা নদী থেকে ডিম আহরণ করে আসছেন হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারার কামাল সওদাগর (৬০)। তিনি বলেন, মঙ্গলবার মধ্যরাতে এবং পরের দিন বুধবার দুপুরে মা মাছ নদীতে ডিমের নমুনা ছেড়েছে। বুধবার দিবাগত রাতে ভাটার সময় মা মাছ পুরোদমে ডিম ছেড়েছে। তবে এবার ডিম সংগ্রহের পরিমাণ একেবারেই কম। আমি ৬টি নৌকা দিয়ে তিন কেজির মতো ডিম সংগ্রহ করেছি।

মধ্যম মাদার্শা এলাকার ডিম আহরণকারী আশু বড়ুয়া বলেন, এবার সংগৃহীত নিষিক্ত ডিমের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, হাটহাজারী ও রাউজান অংশে সরকারি ছয়টি হ্যাচারিতে গোলাকার ও আয়তাকার মিলে মোট ১৫০টি এবং ১৬৫ সিমেন্ট ও ১৭৫টি মাটির কুয়ায় হালদা নদী থেকে আহরণ করা ডিম থেকে রেণু ফোটাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংগ্রহকারীরা।

কৃত্রিম রেণু পোনা উৎপাদনকারী ও বিক্রেতাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর ও নৌ-পুলিশ সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। তাই অসাধু ব্যক্তিদের এ ধরনের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।

মা মাছ প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায়নি দাবি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ডিম দেওয়ার পরে কার্প জাতীয় মা মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় শিকারিরা মা মাছ ধরতে ফাঁদ পাতে। তাই হালদাপাড়ে সার্বক্ষণিক দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত টহলদল পাহারা দিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, হালদা নদীতে গতবছর ২৫ হাজার কেজি, ২০১৯ সালে ১০ হাজার কেজি, ২০১৮ সালে ২২ হাজার কেজি, ২০১৭ সালে ১৬ হাজার কেজি, ২০১৬ সালে ৭৩৫ কেজি, ২০১৫ সালে দুই দফায় ২ হাজার ৮০০ কেজি, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ২০০ কেজি, ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৪০ কেজি, ২০১১ সালে ১২ হাজার ৬০০ কেজি, ২০১০ সালে ৯ হাজার কেজি এবং ২০০৯ সালে ১৩ হাজার ২০০ কেজি ডিম ছাড়ে মা মাছ।

ডিসি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm