মৌসুম শুরু হলেও যে কারণে খালি পড়ে রয়েছে লবণের মাঠ

লবণের মৌসুমে শুরু হয়ে গেলেও কক্সবাজারের বেশিরভাগ লবণ চাষি এখনও মাঠে নামেনি। অথচ সারা দেশে লবণের চাহিদার ৮৭ শতাংশই উৎপাদিত হয় এই কক্সবাজার জেলায়। মূলত বিদেশ থেকে অপরিশোধিত লবণ আমদানির খবরে শঙ্কায় ভুগছেন চাষিরা।

কক্সবাজার বিসিকের তথ্য অনুযায়ী,  প্রতিবছর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি ও ক্ষেত্র বিশেষে আবহাওয়ার বৈরী আচরণে নভেম্বর মাসের শুরুতে লবণ চাষে নামে চাষিরা। কিন্তু মৌসুম শুরু হলেও কক্সবাজারের চকরিয়া উপকূলীয় অঞ্চলের লবণের মাঠ এখনও খালি পড়ে রয়েছে। বিপুল টাকা লগ্নি করে জমি বর্গা নিয়ে চাষে নামতে গিয়ে চরম উদ্বেগ-আতঙ্কে ভুগছেন স্থানীয় লবণ চাষিরা। কারণ মৌসুমের শুরুতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করতে ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে বিসিক। এ খবর মাঠ পর্যায়ের চাষিদের কাছে গেলে তারা চিন্তায় পড়ে যান। লবণ চাষে এ বছরও কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা।

কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদ সভাপতি জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, গত মৌসুমের চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি লবণ এখনো মাঠে মজুত রয়ে গেছে। সেখানে সরকার নতুন করে দেড় লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে উৎপাদন মৌসুম শুরু হলেও আগেকার বছরগুলোর মতো ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায চাষিরা লবণ চাষে মাঠে নামতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে দেশে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। এর আগের মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন।

চাহিদা পূরণে ঘাটতি থাকলেও মৌসুম শেষ হওয়ার ছয় মাস পর পর্যন্ত ৪ লাখ ২০৩ টন লবণ বিক্রি হয়নি। এসব লবণ এখনো মাঠেই পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় লবণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

বিসিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের পশ্চিম বড়ভেওলা, দরবেশকাটা, বদরখালী, ঢেমুশিয়া, রামপুর, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের ৬টি বড় মোকামসহ কক্সবাজারের সাত উপজেলা মিলিয়ে ৫৯ হাজার ৯৯৯ একর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও পটিয়া উপজেলার (আংশিক) ১০ হাজার ৮৯ একর জমিতে প্রতিবছর লবণের চাষ হয়ে থাকে। লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষি।

বিসিকের তথ্য বলছে, দেশে উৎপাদিত লবণের ৮৭ শতাংশই হয় কক্সবাজারের সাতটি উপজেলা থেকে। বাকি অংশ উৎপাদিত হয় বাঁশখালী ও পটিয়ার উপকূলীয় এলাকা থেকে। প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম চলে।

এদিকে কক্সবাজার জেলার মধ্যে শুধুমাত্র কুতুবদিয়ার চাষিরা উৎপাদনে নেমেছে। কিন্তু চাষে নেমে তারা লবণের দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। বর্তমানে মণপ্রতি লবণের দাম ২৪০ টাকা।

চকরিয়া উপজেলার বৃহত্তর লবণ চাষি দরবেশকাটা এন্টারপ্রাইজের মালিক ও ব্যবসায়ী নেতা মাওলানা শহিদুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরুতে আমদানির সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে দেশীয় লবণের দাম অনেক কমে গেছে। এখন এক মণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩০০ টাকার বেশি। এতে চাষিরা আবারও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। প্রতিবছর এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশীয় লবণশিল্প অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বেকার হয়ে পড়বে লবণ চাষ, পরিবহন, গুদামজাত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মানুষ।

এদিকে দেশে মজুত লবণ ব্যবহার করে এই ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক (লবণ সেল প্রধান) সরোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ লবণ মজুত রয়েছে তা চলতি ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলবে। এরপর যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয় সেজন্য দেড় লাখ টন লবণ আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমদানির প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান থেকে অপরিশোধিত লবণ আমদানি করা হবে।

তবে কক্সবাজার লবণ চাষি ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের নেতা মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ অভিযোগ করেন, শিল্প-কারখানা ও কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে প্রতিবছর বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে আসছে। সিন্ডিকেট চক্রের এমন কারসাজির কারণে প্রতিবছর দেশীয় লবণ উৎপাদনে জড়িত স্থানীয় চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকার পরও অযৌক্তিকভাবে আমদানির অনুমতি দিলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, দেশীয় লবণের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ধরে রাখতে হলে সরকারকে চাষিদের জন্য কার্যকর প্রণোদনা দিতে হবে। জমির ভাড়া, সেচ ব্যবস্থা ও শ্রমিকের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। তাই আমদানির পরিকল্পনা বাতিল করে স্থানীয় চাষির কাছ থেকে লবণ সংগ্রহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক জাফর ইকবাল ভূঁইয়া আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, বাজারে লবণের দাম কম থাকায় বেশিরভাগ উৎপাদন এলাকায় অনেক চাষি মাঠে নামেনি এ কথা সত্য। তবে এবার দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে লবণ কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। এজন্য গোডাউন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই আলোকে এবার সরকারিভাবে স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে লবণ কিনে সেটি গোডাউনে মজুত করা হবে।

তিনি বলেন, এখন তো দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতি বিদ্যমান। সেখানে লবণের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাজারে লবণের দাম কম থাকায় প্রান্তিক চাষিরাও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm