মিরসরাইয়ে যে কারণে খুন জুলাই যোদ্ধা

মিরসরাইয়ে খুন হয়েছেন জুলাই যোদ্ধা তাহমিদ উল্যাহ (১৮)।

বুধবার (১০ ডিসেম্বর) রাত ১টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় বারইয়ারহাট পৌর বাজারে একটি দোকানে পায়ের উপর পা তুলে বসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সময় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

তাহমিদ বারইয়ারহাট পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হিঙ্গুলী এলাকার আলমগীর কোম্পানি বাড়ির বাস চালক আলমগীর হোসেন ও বিবি জহুরার একমাত্র ছেলে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন মিরসরাই উপজেলা শাখার যুগ্ম সদস্য সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়া তিনি দি রেড জুলাই মঞ্চের আহ্বায়ক ও ধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চের উদ্যোক্তা ছিলেন। চার মাস আগে তাহমিদ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায় হিঙ্গুলী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জুবায়ের বারইয়ারহাট পৌরসভার একটি দোকানে পায়ের উপর পা তুলে বসেছিলেন। এ সময় দোকানে আসেন বারইয়ারহাট পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক নজরুল ইসলাম লিটন। তাঁকে দেখে পা নামিয়ে না বসায় জুবায়েরকে লাথি মারেন লিটন। এরপর উভয়পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে লিটন ও জুবায়ের নিজ নিজ এলাকা জামালপুর ও হিঙ্গুলীর লোকজন নিয়ে এলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষে জুলাই যোদ্ধা তাহমিদসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত তাহমিদকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে বারইয়ারহাট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১টার দিকে তিনি মারা যান। সংঘর্ষে জড়ানো ও হামলাকারীরা মিরসরাই আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান এবং বারইয়ারহাট পৌরসভার বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক দিদারুল আলম মিয়াজীর অনুসারী।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মিরসরাই আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী নুরুল আমিন চেয়ারম্যান বলেন, তাহমিদের নিহত হওয়ার খবর শুনে আমরা সবাই শোকাহত৷ এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই৷ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি করাতে হবে৷ তবে এটি আমার অনুসারী কিংবা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোনো অন্তঃকোন্দলের কারণে এ ঘটনা ঘটেনি৷ আমি নিশ্চিত করে বলছি, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের জেরে হত্যাকাণ্ড হয়েছে৷

এদিকে নিহত তাহমিদের মা বিবি জহুরা বিলাপ করে বলেন, আমার পুতের খুনি আনি দে৷ আমি তারে দেখতে চাই, জিজ্ঞাস করতে চাই৷ বিকালে পরীক্ষা দিয়ে এসে ভাত খেয়ে ঘরে বসে মোবাইল টিপতেছে৷ বিকেল ৪টার দিকে একটা ছেলে তাকে ফোন দিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য ডাক দিলে সে বেরিয়ে যায়৷ আল্লাহ আজরাইল পাঠাইছে আমার ঘরে, আমার পুতেরে আমার থেকে লই যাইবেরগইরল্লাই৷

তিনি আরও বলেন, আহত হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় পুতেরে অনেকবার জিজ্ঞাস করছি, কে মারছে। হুতে কইতে হারে না, মোবাইল খুঁজছে৷ এটাই ছিল শেষ কথা পুতের লগে৷

নিহত তাহমিদের বড় বোন ফারিহা আক্তার বলেন, আমার ভাই ছিল জুলাই যোদ্ধা৷ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিল৷ সমাজের অনেক মানুষের উপকার করতো৷ ২০২৪ সালে ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার সময়ও সে কাজ করেছে মানুষের জন্য৷ আমার ভাইটাকে নোংরা রাজনীতির লোকজন মেরে ফেলল৷ আমার ভাই একজন কোরআনের হাফেজ ছিল৷ আমাদের একমাত্র ভাইকে আমরা হারিয়ে ফেললাম৷ আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই৷

অপরদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সংগঠক মোহাম্মদ সাইফুল হাওলাদার বলেন, তাহমিদ খান জুলাই যোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সামনের সারির সদস্য ছিল৷ ফেনী জেলা শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার পেটে পুলিশের গুলি লেগেছিল। তিনি দি রেড জুলাই মিরসরাই উপজেলার আহ্বায়ক ছিলেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সদস্য ছিলেন। তাকে এভাবে কুপিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।

যোগাযোগ করা হলে বারইয়ারহাট পৌরসভা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোহন দে বলেন, তাহমিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য ছিল৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন সংগঠনে সে কাজ করেছে৷ কিছুদিন আগে সে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়৷ যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি৷

তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় কদমতলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (মিরসরাই সার্কেল) এএসপি নাদিম হায়দার চৌধুরী বলেন, তাহমিদ হত্যার পেছনে কারা জড়িত, কারা তাকে গুরুতর আঘাত করেছে যার ফলে তার মৃত্যু হয়, এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্ত ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি৷ পরবর্তীতে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব৷

তিনি আরও বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত, যা থেকে বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়৷ তার মরদেহ চমেক হাসপাতালে রয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বাড়ি নিয়ে আসা হবে।

এএ/আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm