‘৩ মৃত্যু’—করোনাকালেই জাপার মহাসচিব বাবলুর পরিবার লণ্ডভণ্ড

মৃত্যু সবসময় বেদনার। একটি মৃত্যু স্তব্দ করে দেয় একটি পরিবারকে। নেমে আসে বিশাল শূন্যতা। বেদনার সেই ক্ষত না শুকাতেই পরপর মৃত্যুর ধাক্কা লাগলে? সেই পরিবারের তখন সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

এমনই ঘটেছে জাতীয় পার্টির মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর পরিবারে। তিন মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছে এই পরিবারটি।

২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর করোনার কাছে হার মানেন হাসান মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ছিলেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর ছোট ভাই। ছিলেন চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং কাশেম নূর ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ারম্যানও।

এরপর চলতি বছরের ১৫ জুলাই না ফেরার দেশে চলে যান আরেক দেশসেরা ব্যক্তিত্ব রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক। যিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির উদ্ভাবক। বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীকারক মুশতাক ছিলেন বাবলুর বড় বোনের স্বামী।

সর্বশেষ শনিবার (২ অক্টোবর) করোনা কেড়ে নেয় এরশাদ সরকারের সময়ে দুই দফার মন্ত্রী আর জাতীয় পার্টির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে।

এই তিন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারেই শূন্যতা তৈরি করেনি, শূন্যতা তৈরি করেছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। চট্টগ্রামকে প্রতিনিধিত্ব করা এ তিন গুণীজনকে হারানোর মধ্যদিয়ে যেন অভিভাবকই হারাল চট্টগ্রাম।

ডাকসুর জিএস থেকে মন্ত্রী

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের কদলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি।

আশির দশকের শুরুতে বাবলু ছিলেন ডাকসুর জিএস। দুই দফায় জাতীয় পার্টির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা বাবুলকে প্রথমে উপদেষ্টা করেছিলেন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার শাসনামলে বাবলুকে শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এরপর বাবলুকে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী করা হয়।

আরও পড়ুন: ৬৬—তেই করোনার কাছে হেরে গেলেন সাবেক মন্ত্রী বাবলু

১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের রাউজান থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বাবলু। পরে ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী আসনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য হন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদের নির্দেশে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।

এরশাদের জীবদ্দশায় ২০১৪ থেকে দুই বছর জাতীয় পার্টির মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন বাবলু। ২০২০ সালে আবার সেই দায়িত্বে ফিরেছিলেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রী অধ্যাপক ফরিদা আক্তার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০০৫ সালে মারা যান।

বাবলু-ফরিদা দম্পতির এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। কয়েক বছর আগেই জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের ভাগ্নি মেহেজাবুন্নেসা রহমান টুম্পাকে বিয়ে করেন বাবলু।

গত ৬ সেপ্টেম্বর জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে একবার লাইফ সাপোর্টেও নেওয়া হয়। শেষপর্যন্ত প্রাণঘাতী করোনার কাছে হেরে যান জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। শনিবার (২ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৯টায় রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

করোনার কাছেই হেরে গেলেন ‘মানবিক মানুষ’

Thai Food

করোনার মাঝামাঝি সময়ে পরিবারের সদস্য হাসান মাহমুদ চৌধুরীর মৃত্যু হয়। করোনার প্রকোপেও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো লোকটি না ফেরার দেশের চলে যান করোনার ছোবলে।

করোনার শুরু থেকে ঢাকায় অবস্থান করে চট্টগ্রামে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম তদারকি করছিলেন হাসান মাহমুদ চৌধুরী। করোনার প্রকোপ দিন দিন বাড়তে থাকায় চট্টগ্রামের মানুষের হাহাকারে আর ঢাকা বসে থাকতে পারেননি এই মানবদরদী। চট্টগ্রামে এসে নিজে মানবিক সহায়তা নিয়ে ছুটে যান মানুষের দ্বারে দ্বারে।

করোনা আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রামের জন্য ৫ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সেবকদের নতুন পোশাকের জন্য ২০ লাখ টাকাসহ চসিককে ২২ লাখ টাকার অনুদান দেন। এছাড়া হাসান মাহমুদ চৌধুরী দেশে করোনা মহামারিতে অন্তত দেড় লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের ঘরে পোঁছে দেন খাদ্য সহায়তা।

মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হন হাসান মাহমুদ চৌধুরী। ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান এই সমাজসেবক।

চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও কাশেম-নুর ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ারম্যান ছিলেন এই মানবিক মানুষ। তিনি ল্যাটিন আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও থাই চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক হিসেবেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

বঙ্গবন্ধু উপাধির উদ্ভাবক

করোনায় পরিবারের এক সদস্যকে হারিয়ে যখন শোকে মুহ্যমান তখন পরিবারে নেমে আসে আরেক ঝড়। দেশের আরেক নামকরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলুর বড় বোনের স্বামী ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির উদ্ভাবক রেজাউল হক মুশতাক চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

১৯৬৮ সালে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা মামলার প্রহসনমূলক বিচারে মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় শোনার অপেক্ষায়। সেই সময় ঢাকা কলেজের এক ছাত্র, তার পুত্র শেখ কামালের সহপাঠী রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক বঙ্গশার্দুল শেখ মুজিবের জন্য নতুন এক উপাধি উদ্ভাবন করলেন। সেই উপাধি ‘বঙ্গবন্ধু’।

এর এক বছর পর শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি হলেন। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তার সম্মানে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেদিন থেকে শেখ মুজিব হয়ে গেলেন ‘বঙ্গবন্ধু’।

সেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির উদ্ভাবক ও ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জীবনীকার ছিলেন রেজাউল হক মুশতাক।

আরও পড়ুন: মার্কিন দূতাবাসে বঙ্গবন্ধুর ৩ দুর্লভ ছবি

১৯৫০ সালের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার ভিংরোল গ্রামের মিয়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন রেজাউল হক মুশতাক। তার বাবা মরহুম নুরুল হক চৌধুরী এবং মা মরহুমা মুসলিম আরা। গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা হলেও তিনি চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটায় ছোটবেলা থেকে জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় পার করেন।

চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুলে অধ্যয়নকালে ১৯৬৫ সালে তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ১৯৬৬-৬৭ সালে নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের নির্বাহী কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য। মুসলিম হাইস্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে।

এ সময় তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যমণি শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে সহপাঠী হিসেবে তার পরিচয় ঢাকা কলেজেই। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি নির্বাচিত হন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সহদপ্তর সম্পাদক।

রেজাউল হক মুশতাক একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন। তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭২ সালে সফলতার সঙ্গে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে নির্বাচিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যথাক্রমে অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ২০২১ সালের ১৫ জুলাই দিবাগত রাত ১টায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির সেই উদ্ভাবক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এসি

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm