‘ফাঁদ’ কম দামে ব্র্যান্ডের পণ্য, টোপ গিললেই সর্বনাশ

নগরের বিভিন্ন স্থানে এখন অবাধে বিক্রি হচ্ছে নকল পণ্য ও ভেজাল খাদ্যসামগ্রী। নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে কোথাও অর্ধেক, কোথাও অর্ধেকেরও কম দামে মেলে এসব পণ্য! প্রশাসনের অগোচরে হচ্ছে এমনটাও নয়। তবুও প্রতিদিন ক্রেতা-বিক্রেতার বিকিকিনিতে জমজমাট নকল পণ্যের বাজার।

বর্তমানে দেশের প্রায় সবখানেই নকল পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এর ব্যতিক্রম নয় চট্টগ্রামেও। একইরকম দেখতে প্যাকেট/স্টিকার ব্যবহার করায় আসল-নকল চেনা কষ্টকর হয়ে পড়ে। নকল মোবাইলসামগ্রী, যন্ত্রাংশ, ঘড়ি, জুতা, কাপড় এমনকি নকল বই পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যেই!

ভোগ্যপণ্যেও আছে নকল। সেমাই থেকে শুরু করে নুডলস, মসলা, ঘি, জুস, তেলসহ প্রায় সব পণ্যেই আছে ভেজাল। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে করা হচ্ছে ভেজাল!

যুগের পরিবর্তনে এখন ফুটপাতের পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে নকল পণ্য। নগদ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভালো পণ্য মেলে। তবে অগ্রিম টাকায় ত্রুটিপূর্ণ পণ্য পাওয়ার অভিযোগ অজস্র।

জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, উপজেলা প্রশাসন, বিএসটিআইসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের পক্ষ থেকে নকল-ভেজাল পণ্য বিক্রি বন্ধে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে সুফল মিলছে কম। অনেকক্ষেত্রে অভিযান কয়েকদিন বন্ধ থাকে, এ সুযোগে ফের পুরোদমে শুরু হয়ে যায় নকল পণ্য তৈরি ও বিক্রি।

এদিকে বছরের পর বছর মানহীন, নকল ও ভেজাল দ্রব্য খেয়ে এবং ব্যবহার করে দেশে বাড়ছে রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। লিভার ও কিডনি রোগ থেকে শুরু করে জটিল সব রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে।

নকল পণ্যের বিশাল বাজার নগরের নিউমার্কেট এলাকা। সরেজমিন দেখা যায়, নিউমার্কেটের বিপরীতে দোস্ত বিল্ডিংয়ের পাশের ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে চার্জার, ব্যাটারি, হেডফোন, কাভারসহ মোবাইলসংশ্লিষ্ট অনেককিছু। কিন্তু এর অধিকাংশই মূল ব্র্যান্ডের নয়। তাই কিছুদিন ব্যবহারেই এগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

একটু এগিয়ে স্টেশন রোডের দিকে গেলে মিলবে মোবাইল, ঘড়ি, জুতাসহ নানা পণ্য, তাও অবিশ্বাস্য কম দামে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, এগুলো চোরাই পণ্য।

স্টেশন রোডের উল্টো দিকে নুপুর মার্কেটের সামনের ফুটপাতে মিলবে পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, গল্প, উপন্যাসসহ নানা বই। এসব বইয়ের বেশিরভাগই ব্যবহৃত। তাই সাধারণত অর্ধেক দামেই পাওয়া যায়। সেটা সমস্যা নয়, বরং উপকারী। কিন্তু সমস্যা নতুন বইগুলো নিয়ে।

বিশ্বখ্যাত লেখকদের বই এখানে পাওয়া যায় নামমাত্র মূল্যে। দেশি থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বইও বাদ যায় না। ঝকঝকে প্রচ্ছদে একদম নতুন বই। কিন্তু আদতে এগুলো নকল বা পাইরেটেড ভার্সন। দাম যা লেখা থাকবে তার অর্ধেক দামেই বইটি পেয়ে যাবেন। তবে যে বইটি কিনছেন তা ফটোকপি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাঁধাইও সুবিধার নয়।

আরেকটু এগিয়ে গেলে মিলবে ভ্রাম্যমাণ প্রসাধনীর স্টল। চৌকি বা টেবিল পেতে বিক্রি করা এসব ‘দোকানে’ বিশ্বসেরা ‘ব্র্যান্ডের’ প্রসাধনসামগ্রী মিলবে নামমাত্র মূল্যে। এসব প্রসাধনসামগ্রী আসল তো নয়ই, বরং এমন সব উপাদান বা কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি যা মানবদেহের জন্য বড় ক্ষতির কারণ।

এবার আসা যাক জলসা মার্কেটের সামনে। এখানে মিলবে ‘নামি’ ব্র্যান্ডের ‘দামি’ ঘড়ি। তবে দামটা আপনার নাগালের মধ্যেই। এমনও হতে পারে ৫০ হাজার টাকার একটি ‘টাইটান’ ঘড়ি আপনি পেয়ে যেতে পারেন মাত্র ২০০ টাকায়! এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই ঘড়িটি নকল। শুধুমাত্র ডিজাইনটা একই আর উপরে-নিচে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের নাম খোদাই করা। এসব ঘড়ি নষ্ট হলে মেরামত না করাই ভালো। কারণ মেরামত করতে গিয়ে দামটা ঘড়ির দামের মতোই পড়বে!

তামাকুমণ্ডী লেইনে যাওয়া যাক। এখানে হরেকরকম ডিজাইনের মোবাইল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পাবেন একেবারে কম দামে। কিন্তু সমস্যা একটাই, যদি নষ্ট হয়ে যায় বিক্রেতার দায় নেই।

এবার তামাকুমণ্ডী লেইনের সামনের ফুটপাতে আসা যাক। অবশ্য শুধু ফুটপাত নয়, রাস্তার পাশে একটা বড় অংশজুড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল জুতার বাজার। সস্তায় জুতা মিলবে, কিন্তু টিকবে কতদিন সে গ্যারান্টি নেই। আর দেখতে নামি ব্যান্ডের জুতার মতোই। কিছু ক্ষেত্রে নামি ব্র্যান্ডের নাম আর লোগো পর্যন্ত কম-বেশি এদিক-ওদিক করে সেঁটে দেওয়া হয়। ক্রেতারাও নির্দ্বিধায় কিনছেন ‘বাহারি’ জুতা।

রাস্তার উল্টো দিকেও আছে ‘প্রতারণার ফাঁদ’। ফুটপাতে থরে থরে সাজানো শার্ট-প্যান্ট। স্টিকার বা ট্যাগও লাগানো থাকে বাহারি ব্র্যান্ডের। কিন্তু এগুলোও অনেকক্ষেত্রে ব্র্যান্ড পণ্যকে নকল করেই তৈরি করা। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য গার্মেন্টসের ভালো মানের কাপড় কম দামে কিনতে পাওয়া যায় (শিপমেন্টের সময় বাতিলকৃত)। কিন্তু সব দোকানে (পড়ুন স্টলে) নয়।

মোটামুটি এই হলো নিউমার্কেটের ফুটপাতের অবস্থা। নগরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের ফুটপাতেও কম-বেশি এসব পণ্য পাওয়া যায়। তবে নিউমার্কেটের ফুটপাতেই সবচেয়ে বেশি জমজমাট নকল পণ্যের বাজার।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাতকরণ রোধ করতে।

জানতে চাইলে কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, চট্টগ্রামসহ সারাদেশ এখন নকল ও ভেজাল পণ্যে সয়লাব হয়ে গেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে গত ১০ বছর ধরে বলে আসছি। বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জনবল সংকটের অজুহাত দেন। অথচ বিদ্যমান জনবল দিয়ে সঠিকভাবে তদারকি করলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা অনেক কমে আসত।

ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। অনলাইন-অফলাইন যাই কিনুন না কেন, কিনতে হবে দেখেশুনে— যোগ করেন এসএম নাজের হোসাইন।

জেডএইচ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm