‘নেতার’ প্রশ্রয়েই যত অপকর্ম পটিয়ার জমিরের, ২৯ মামলা কাঁধে—তিনিও ‘নেতা’

নিজেকে ‘যুবলীগ নেতা’ পরিচয় দিতে পছন্দ করেন তিনি। তবে হালে আর সেই পরিচয় দেন না। এখন পরিচয় দেন ‘সাবেক নেতা’। অথচ নেতার আড়ালে তিনি ভয়ঙ্কর অপরাধী। যাঁর কাঁধে ঝুলছে অপরাধের ২৯ মামলা। পটিয়ার মূর্তিমান এই আতঙ্কের নাম ডিএম জমির উদ্দিন।

জমিরের সেকেন্ড ইন কমান্ড সাইফুল ইসলাম ওরফে বালু সাইফুল ও ইকবাল হোসেন। খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ থেকে মাদকবাণিজ্য—সব অপরাধই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।

এদিকে অপরাধ জগতের গডফাদার ডিএম জমির নিজেকে বাঁচাতে এখন জার্সি বদলে আশ্রয় নিয়েছেন যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতার। ওই নেতার প্রশ্রয়েই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন: পটিয়ায় ইয়াবাসহ আটকের পরদিন জানা গেল তিনি চকরিয়ার চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার আসামি!

গত ১৬ এপ্রিল অপহরণ মামলা তুলে নিতে নিজের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মোটরসাইকেলে শোডাউন করেন ডিএম জমির। এ সময় স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এরপর এলাকার লোকজন তাদের ধাওয়া করে। কিন্তু জনরোষের এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে তারা সাজান ‘ব্রাশফায়ার’ নাটক। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই এমন নাটক সাজানো হয়েছে—বলছে খোদ পুলিশই।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডিএম জমিরের একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালীতে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ সংঘটিত করছে। খুন, অপহরণ, ডাকাতি, জায়গা দখল, চাঁদাবাজি, চুরি ও ছিনতাই তাদের রুটিন ওয়ার্ক।

পাহাড়-সমতালে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ডিএম জমির উদ্দিন সেকেন্ড ইন কমান্ড বালু সাইফুল ও উইথপ্রু মারমাও। পাহাড়ের ত্রাস উইথপ্রু মারমা, আর সমতলে বালু সাইফুল। তাদের গ্রুপের সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে চালক, কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে ধরে গভীর জঙ্গলে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে।

আরও পড়ুন: রাতের আঁধারে বায়েজিদে যুবককে ছুরি মেরে পালাল ছিনতাইকারী

২০২০ সালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা চাঁদার জন্য পটিয়া থেকে মোসলেম উদ্দিন নামের একজকে অপহরণ করেন নিয়ে যায়। দুবছরেও পুলিশ মোসলেমের খবর পায়নি।।

এছাড়া ডিএম জমির উদ্দিন, বালু সাইফুল ও উইথুপ্রু মারমা মিলে পাহাড়ি মদ এনে পটিয়াসহ আশপাশের উপজেলায় বিক্রি করেন। পাহাড়ে তাদের রয়েছে একাধিক সন্ত্রাসী আস্তানা। দল ভারী করতে স্থানীয় কিশোরদের গহীন পাহাড়ে নিয়ে উইখুপ্রু মারমা অস্ত্র চালনাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রশিক্ষণ দেন।

ডিএম জমির উদ্দিনের কিশোর গ্যাং লিডার দিহানের নেতৃত্বেও রয়েছে কয়েকশ কিশোরের বড় গ্যাং। এসব কিশোরকে কাজে লাগান বড় অপরাধে। সদর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক বেচাকেনা করে।

দিহান পটিয়া থানার একাধিক মামলার আসামি সাবেক কমিশনার আবদুল মান্নানের ছেলে। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি উপজেলার কমল মুন্সির হাট থেকে গ্যারেজ কর্মচারী আবদুল গফুরকে ছুরিকাঘাত করে দেড় লাখ টাকা নিয়ে যায় দিহান ও তার গ্রুপের সদস্যরা। কিন্তু কিশোর গ্যাং লিডার দিহানের ভয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করার সাহস পায় না।

আরও পড়ুন: ছিনতাইকারী ধরতে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী!

ডিএম জমিরের ভাতিজা এমকে আজাদ, সাইফুদ্দিন ভোলা, সুজন বড়ুয়া মিলে পটিয়া সদরসহ আশপাশের সিএনজি অটোরিকশা, টেম্পু, বাস মিনিবাস ও ব্যাটারিচালিত রিকশা স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন।

অন্যদিকে কিসলো গ্রুপের মোটা আনিস, পিস্তল ফারুকের মূল কাজ জায়গা দখল। এছাড়া পটিয়া থানার পাশে বেরাজ্জা কলোনীতে গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডও চালান। ২০২১ সালের জুলাইয়ে মুজিববর্ষ উপলেক্ষে পটিয়ার হাইদগাঁও গুচ্ছগ্রামে গৃহহীনদের জন্য নির্মিত প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরও ভাঙচুর করে তারা। এ ঘটনায় ৪ আগস্ট প্রকল্প কর্মকর্তা সুপ্তশ্রী সাহা ও ঠিকাদার আবুল হাসান বাদি হয়ে সাইফুল ইসলাম প্রকাশ বালু সাইফুল ও সাইফুদ্দিন ভোলার নামে পৃথক দুটি প্রসিকিউশন মামলা করেন।

আরও পড়ুন: যেকোনো মূল্যে সিআরবিকে বাঁচাতে হবে : হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর

এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত ১৬ এপ্রিল জাহিদ হাসান হৃদয় নামের এক পিকআপ চালককে অপহরণ করে বেদম মারধর করা হয়। এ ঘটনায় পটিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন জাহিদ হাসানের পরিবার। মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য বাদির পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করতে ১৯ এপ্রিল রাতে আমজুরহাট এলাকায় ডিএম জমির উদ্দিন, এয়ার মোহাম্মদ, বালু সাইফুলসহ ১০-১৫ জনের একটি দল মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন দেয়। এ সময় ক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া করে। জনরোষ থেকে বাঁচতে বালু সাইফুল গুলি ছুঁড়ে কোনোরকমে পালিয়ে যান।

রাতের আঁধারে এ ঘটনায় ডিএম জমির উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। গণধোলাইয়ে আহত হন সাইফুল ইসলাম প্রকাশ বালু সাইফুল ও ইকবাল হোসেন। তবে তারা এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে ‘নাটক’ সাজান। তারা প্রচার করেন, ইফতার মাহফিলে দাওয়াত করতে যাওয়ার পথে স্থানীয় এমপি সামশুল হক চৌধুরীর ভাই নবাবের লোকেরা তাদের ওপর গুলি ছুঁড়েছে। এরপর পটিয়ায় রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে সন্ত্রাসী জমির গ্রুপ।

আলোকিত চট্টগ্রাম

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।

ksrm