জামায়াতকে সরকারের বাইরে রাখতে চাইছে না আমেরিকা

আমেরিকার সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের অডিও ফাঁসের পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতির মাঠ। অডিও সূত্র ধরে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, বাংলাদেশে আমেরিকার প্রথম পছন্দ জামায়াতে ইসলামী। আবার এ নিয়ে বিশাল প্রতিবেদন করেছে ভারতের সংবাদপত্র ‘এই সময়’। সেখানেও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সাবেক হাইকমিশনারের মন্তব্য নিয়ে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি। পাঠকদের এসব তুলে ধরছে আলোকিত চট্টগ্রাম।

নির্বাচনের পরে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে কি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে? নির্বাচনে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও সেই সরকারে কি গুরুত্বপূর্ণ দুই শরিক হিসেবে থাকবে বিএনপি-জামায়াত? বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই গোপনে একটা পরিকল্পনা হচ্ছে বলে নজরে এসেছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের। সম্প্রতি কয়েকটি বিষয় সামনে আসায় তাঁরা মনে করছেন, জামায়াতকে এবার আর কোনোভাবেই সরকারের বাইরে রাখতে চাইছে না আমেরিকা।

সম্প্রতি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের এক কর্তার সঙ্গে সাংবাদিকদের কথোপকথনের অডিও ফাঁস করেছে আমেরিকার সংবাদপত্র ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’। ওই সংবাদপত্রের দাবি, বাংলাদেশের মসনদে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম পছন্দ এখন জামায়াতে ইসলামী। আমেরিকাও জামায়াতের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক। এমনকি সাংবাদিকরা যাতে এই উদ্দেশ্যপূরণে এগিয়ে আসেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাবও তাঁদের দেন মার্কিন দূতাবাসের ওই কর্তা।

নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনও নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করেছেন অভিন্ন সুরে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নতুন জমানায় ইসলামি শক্তি জনপ্রিয় হয়েছে। নির্বাচনে তাই জামায়াতে ইসলামী বেশ ভালো ফল করবে বলে মনে করছি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে জামায়াতের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্ব সবচেয়ে নিবিড়। আমেরিকা বরাবরই জামায়াতের পাশে থেকেছে। একাত্তরে আমেরিকাও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, জামায়াতও পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গড়ার শুধু বিরোধিতাই করেনি— মুক্তিকামী মানুষদের গণহত্যায় জড়িত ছিল। বন্ধুত্বের উদাহরণ হিসাবে বিশ্লেষকেরা তুলে আনছেন গণহত্যাকারী রাজাকার নেতাদের ফাঁসি রদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে আমেরিকার তৎকালীন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টনের দরবার করার ঘটনাকেও। হাসিনা যা খারিজ করে ওয়াশিংটনের চক্ষুশূল হন।

এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলছেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে একদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া গেছে, পাশাপাশি ইসলামি দল জামায়াতের প্রভাব বলয়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এই অনুকূল পরিস্থিতিতে বন্ধু জামায়াতকে কোনোভাবেই আর নির্বাচনপরবর্তী সরকারের বাইরে রাখতে চাইছে না আমেরিকা। আমেরিকার স্বার্থ পূরণে তারাই সর্বোত্তম হবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

এদিকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করা এক কূটনীতিক বলেন, জামায়াতকে বরাবরই প্রগতিশীল ইসলামি শক্তি হিসেবে দেখে আমেরিকা। তাদের নেতাদের শিক্ষিত, ধনী, সৎ এবং ভদ্র–সভ্য বলে মনে করে। আমি আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট বন্ধুদের যখন বলতাম, দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের পাণ্ডা এই জামায়াতে ইসলামীর নেতারা, সন্ত্রাসের এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় তারা স্মাগলিং থেকে মাদক ব্যবসা, সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটা সমান্তরাল অর্থনীতি চালায়— তারা সেসব কানেই তুলতেন না। বাস্তবে আমেরিকা আগেও চেয়েছে, জামায়াত বাংলাদেশের মসনদে আসুক। কিন্তু মানুষ ভোট না-দিয়ে জামায়াতকে ঠেকিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে এবার সেই মিশন দিয়েই পাঠিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। জাতীয় সরকার গঠনের এই প্রস্তাবটি আদতে পাকিস্তানের। ফলে আমেরিকার এই মিশনে পাকিস্তানও রয়েছে কিনা, তা নিয়েও জল্পনা রয়েছে।

ভারতের একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, সম্প্রতি মার্কিন বিদেশ দপ্তরের দুই কর্তা ঢাকায় গিয়ে ইউনূস সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনোত্তর পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তাঁরা যুক্তি দিয়েছেন, শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি খুবই সংবেদনশীল। অর্থনীতি থেকে সংবিধান, প্রশাসন থেকে বিচার ব্যবস্থা— সর্বত্র আমূল সংস্কার করার পক্ষে জনগণ গণভোটে রায় দেবেন বলে তাঁরা জেনেছেন। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলির উচিত বিরোধিতা ভুলে ‘জুলাই স্পিরিট’ অনুসারে সংস্কারের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিভাজনের ফলে যাতে পরাজিত শক্তি ক্ষমতায় না ফিরতে পারে, তা–ও নিশ্চিত করতে হবে। সম্ভাব্য জাতীয় সরকার এ বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে, যাতে ‘অল আর উইনার, নো লুজ়ার’।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, সম্প্রতি জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বেশ কয়েকবার জাতীয় সরকারের কথা বলেছেন। জানুয়ারির প্রথম দিনে মা হারানো বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে এসেও নির্বাচনের পরে ‘বিরোধিতাহীন জাতীয় ঐক্যের সরকার’ নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেন শফিকুর। পর্যবেক্ষকদের একাংশের দাবি, এখন আমেরিকা চায় ইউনূস সরকারের উপরে প্রভাব খাটিয়ে জামায়াতের একটা অভাবনীয় ভালো নির্বাচনী ফলাফল দেখাতে, যার ফলে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা হলেও তাতে যথেষ্ট প্রভাব থাকতে পারে জামায়াতের। এজন্য আমেরিকা সাংবাদিকদের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছিল। ওয়াশিংটন পোস্টের ফাঁস করা অডিওতে দূতাবাসের কর্তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, জামায়াতের শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাদের যেন বেশি বেশি করে টক-শোতে ডাকা হয়।

জামায়াত ‘খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটবে না’ বলেও আশাপ্রকাশ করেন দূতাবাসের ওই কর্তা। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে অডিওটির সারবত্তা মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে এ–ও বলা হয়েছে, সেদিন জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলিকে নিয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিরা আলোচনা করেছিলেন।

এদিকে বিএনপির আচরণেও ‘অতিরিক্ত সংযম’ দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। যাকে ‘সন্দেহজনক’ মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও তারেক থেকে মির্জা ফখরুল, কেউ জামায়াতকে সেভাবে বিঁধছেন না। একাত্তরে তাদের কর্মকাণ্ডকে প্রচারে টানছেন না। যেটুকু সমালোচনা করছেন, তা-ও ঠারেঠোরে, নাম না করে। ভবিষ্যতে জামায়াত-এনসিপিকে নিয়ে সরকার গড়তে হবে বুঝেই কি প্রত্যাশিত বিরোধিতায় লাগাম টানছেন বিএনপি নেতারা? আবার রাজনৈতিক একটি সূত্র বলছে, বিএনপির এক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিকত্ব লুকিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার অভিযোগকে হাতিয়ার করে তাদের কার্যত ব্ল্যাকমেল করছে জামায়াত ও আমেরিকা। জামায়াতের দাবি, এ বিষয়ে উপযুক্ত প্রমাণ তাদের সংগ্রহে রয়েছে, যা প্রকাশ করলে রাজনীতির মোড় ঘুরে যেতে পারে। সম্প্রতি ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও দুই বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লুকিয়ে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগ করেছে।

তবে জামায়াতের বাড়বাড়ন্ত এবং তাদের প্রতি আমেরিকার ‘পক্ষপাত’ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারত মধ্যপন্থী হিসাবে বিএনপির প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করছে। তবে জামায়াত অভিযোগ করছে, ভারতের সঙ্গে ‘গোলামির চুক্তি’ করে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। তবে বিএনপি বলছে, এই অভিযোগ অসার।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm