শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া না মেনে অনেকটা গায়ের জোরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামে ইপিজেডে প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের দুই পোশাক কারখানা। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভ থেকে হঠাৎ শুরু হয় সংঘর্ষ। এতে ২০ জন শ্রমিক রক্তাক্ত হন।
সোমবার (১০ জানুয়ারি) সকাল থেকে দফায় দফায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে ইপিজেড এলাকার, বেপজা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে শ্রমিকদের অভিযোগ, হামলকারীরা ভাড়াটে গুণ্ডা। তারা কারখানার ভেতর থেকে হঠাৎ বের হয়ে কারখানার গেটে অবস্থান করা নিরীহ শ্রমিকদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে নির্দয়ভাবে পেটায়। তাদের হামলায় অন্তত ২০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন।
জানা যায়, কোনো ঘোষণা ছাড়াই গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে কারখানার গেটে টাঙিয়ে দেওয়া অনিদিষ্টকালের বন্ধের নোটিশ। এমন ঘোষণায় হঠাৎ বেকার হয়ে পড়ে দুই কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক।
এদিকে শ্রমিকদের ওপর হামলার বিষয়ে জানতে প্যাসিফিক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ও প্যাসিফিক ক্যাজুয়ালস লিমিটেডের মালিক সাঈদ এম তাহমিরের মুঠোফোনে একাধিক কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
আরও পড়ুন : রক্তাক্ত শতাধিক শ্রমিক, যে কারণে রণক্ষেত্র সিইপিজেড
জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে মাত্র ২০০ শ্রমিকের ছোট কারখানায় চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করে প্যাসিফিক। নাম ছিল এনজেডএন ফ্যাশন। এক দশক পর চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্যাসিফিক জিন্স নামে ১৯৯৪ সালে নতুন রূপে পথচলা শুরু করে। তখন শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দেড় হাজার। কিন্তু এখন প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডে প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত ৩২ হাজার মানুষের। শুধু চট্টগ্রাম ইপিজেডে এই গ্রুপের রয়েছে ছয়টি কারখানা।
ইপিজেডের বাইরে রয়েছে নিট পোশাকের আরেকটি কারখানা। ২০০০ সালে তারা যুক্ত করে ‘জিন্স ২০০০’ নামে নতুন কারখানা। ২০০৮ সালে যুক্ত করে আরেক কারখানা ‘ইউনিভার্সেল জিন্স’।
২০১৪ সালে উৎপাদনে যায় ‘এনএইচটি ফ্যাশন’। ২০১৮ সালে যুক্ত হয় ‘প্যাসেফিক ক্যাজুয়েলস’। ২০২১ সালে উৎপাদনে যায় আরেক নতুন কারখানা ‘প্যাসিফিক নিট্যাক্স’। এতকিছুর পরও শ্রমিককে মারধর ও কারখানার শ্রমিক অসন্তোষ, কোনোভাবেই রোধ করতে পারছেন না প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা।
এদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি নোটিশের মাধ্যমে ইউনিট-১ ও ইউনিট-২ বন্ধের ঘোষণা দেয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। কারখানার মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়, ইপিজেড শ্রম আইন ২০১৯-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, শ্রমিকরা অবৈধভাবে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন এবং অযৌক্তিক দাবি তুলেছেন, যা কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এ কারণে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউনিট দুটি বন্ধ থাকবে।
অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, টানা এক মাস ধরে বিভিন্ন দাবিতে কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ চলছিল।
প্যাসিফিক ক্যাজুয়ালস লিমিটেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত এক মাস ধরে শ্রমিকরা নাস্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। তবে মজুরি বা ভাতার সঙ্গে এই অসন্তোষের কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, ম্যানেজমেন্ট আগে শ্রমিকদের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু রোববার সকালে আবারও শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন, যা শেষ পর্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুপুর ২টার দিকে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু এই দুটি ইউনিটে ৬-৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে মালিকপক্ষ কিছু শ্রমিককে বাড়তি সুবিধা দিয়ে তাদের পক্ষে ভাগিয়ে নেন। কিন্তু কারখানার শ্রমিকদের ৮০ শতাংশই ছিল বঞ্চিত। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের ওপর হামলা চালান। বঞ্চিত শ্রমিকরা তা প্রতিরোধে এগিয়ে আসলে আহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের এএসপি জসিম উদ্দিন বলেন, আজ সকালে বন্ধ কারখানার শ্রমিকরা এসে একই মালিকানাধীন অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের বের করার চেষ্টা করেন। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
এএসপি আরও বলেন, অন্য কারখানার শ্রমিকরা বলছেন, তাদের কারখানা তো বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি, তাহলে তারা কেন কাজ বন্ধ করবেন? এ নিয়েই দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুস সোবহান বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি, তবে এখনো বিস্তারিত জানি না। এটা সত্য যে, কারখানা বন্ধের ঘোষণার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
আলোকিত চট্টগ্রাম


