চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে মরছে মানুষ, তবু চলছে পাহাড় বেচাকেনা

বিশাল এলাকাজুড়ে পাহাড়ের পাদদেশে যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করে বসবাস করছে হাজার হাজার মানুষ। সমতল থেকে দুইশ ফুট বা এরও বেশি ওপর পর্যন্ত পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বেঁধেছে ঘর। পাহাড়ঘেঁষে মজবুত গাঁথুনির শক্ত প্রাচীর। তারপরও প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনে ধ্বংস হচ্ছে এসব ঘর। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শুরু হয় তাদের মৃত্যু দিয়ে। তবুও সজাগ নন এসব এলাকায় বসবাসরত মানুষ। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের দখলে থাকা পাহাড় কম দামে কিনে বসতি গড়ছে ছিন্নমূল মানুষগুলো।

আকবরশাহ পূর্ব ফিরোজশাহ কালোনি ১ নম্বর ঝিল এলাকা ও ফয়’স লেক বিজয়নগরের পাহাড়ে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।

এসব এলাকা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দুইশ থেকে তিনশ ফুটের বেশি উঁচু দুটি খাড়া পাহাড়। গতকাল শুক্রবার (১৭ জুন) সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ভারি বর্ষণ। সেই বর্ষণের ফলে ঘণ্টার ব্যবধানে ধসে পড়ে পাহাড় দুটি। মুহূর্তেই ধসে পড়া পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়ে প্রাণ হারায় দুই পরিবারের আপন চার ভাই-বোন।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামে পাহাড়ধস—যেভাবে বেঁচে গেল জমজ শিশু

Yakub Group

প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও অসাধু ভূমি দখলদারদের বলয়ে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। আর সেখানে নিম্ন আয়ের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকেন। এদিকে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হলেও এসব পরিবারের জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয় না।

এদিকে পাহাড়ধসে সহোদর দুবোনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরলে ১ নম্বর ঝিল এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। ভিড় ঠেলে পাহাড়ধসে ভেঙে পড়া বসতির কাছে গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড়ের পাদদেশে মজবুত গাঁথুনি দিয়ে বাড়ি করেছেন ফজলুল হক। স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন এই ঘরে। শুক্রবার রাতে সমতল থেকে আনুমানিক দুইশ ফুটের বেশি উচ্চতা থেকে সযত্নে গড়া ঘরের ওপর ধসে পড়ে পাহাড়। স্ত্রীসহ নিজে আহত হলেও হারিয়েছেন দুই মেয়েকে।

অন্যদিকে ফয়’স লেক বিজয়নগরে পাহাড়ধসে দুই সহোদর ভাইয়ের মৃত্যু হয়। তাদের মা নূরজাহান বলেন, ‘চার ছেলের মধ্যে লিমন ও ইমন আমাকে নিয়ে এই ঘরে বসবাস করত। শুক্রবার দুপুরে ইমনের স্ত্রীকে দেখতে তাদের বাড়িতে বেড়াতে যায় আমার দুই ছেলে। এ সময় আমি অন্য ছেলের বাসায় যায়। ইমনের শ্বশুরবাড়িতে থাকার কথা ছিল, তাই আমিও বাসায় ফিরেছি রাত করে। রাত ৩টার চেয়ে বেশি সময় পর আমি বাসায় ফিরে দেখি ঘরের দরজা ভেঙে গেছে। চুরি হয়েছে ভেবে সামনের দিকে এগোতে দেখি ঘরভর্তি মাটি। এ সময় আশপাশের লোকজনকে জানালে তারা ছেলের নম্বরে ফোন দেয়। ফোন রিসিভ না করায় ফায়ার সার্ভিসে জানায় স্থানীয়রা। পরে তারা এসে আমার দুই ছেলেকে উদ্ধার করে।

এ সময় কথা হয় রানু নামে এক মধ্যবয়সী নারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে ২ লাখ টাকায় জায়গা কিনে ঘর করেছি।’

কার কাছ থেকে এ জায়গা কেনা হয়েছে−জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে যারা থাকতেন তাদের কাছ থেকে কিনেছি।

আরও পড়ুন: ‘ফাঁদ’—আক্তারুজ্জামান ফ্লাইওভারে গাড়ি তুললেই ভয় পাচ্ছেন চালকরা

এদিকে জঙ্গল সলিমপুর বায়েজিদ কাদেরশাহ মাজারের পাশে পাহাড়ধস হলেও চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় চাপা পড়েছে এ ঘটনা। এ ঘটনা কেউ জানে না। কারো ক্ষতি না হলেও পাহাড়ধসে মাটি ঘর ঘেঁষে পড়েছে উঠানে। এতে ঝুঁকি থাকলেও গায়ে মাখছে না ঘরের মালিক আসিফ। তিনি বলেন, ‘আমার বাড়ি বাঁশখালী। তবে সেখানে কোনো সম্পদ না থাকায় এখানে এসে বসত করেছি। এখন সব সয়ে গেছে। পাহাড়ধসে মৃত্যু হলেও কিছু করার নেই। কারণ এ ঘরের বাইরে গিয়ে থাকার মতো জায়গা আমাদের নেই।’

আশ্রয়কেন্দ্রে কেন যাননি− জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো সময় পাহাড়ধস হয়নি। গতকাল রাতে সামান্য মাটি পড়েছে। এতে ভয়ের কিছু নেই। পাহাড়ের মাটি শক্ত আছে।’

নগরে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে যেসব পাহাড়ে
এক নম্বর ঝিল পূর্ব ফিরোজশাহ পাহাড়, রেলওয়ে লেকসিটি বিজয়নগর পাহাড়, বায়েজিদ জঙ্গল ছলিমপুর কাদেরশাহ মাজার, মিয়ার পাহাড়, আকবরশাহ আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, একে খান পাহাড়, রেলওয়ে পাহাড়, পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়, মধুশাহ পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, লালখানবাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়, কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়সহ এমন অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বসবাস করে আসছে হাজার হাজার নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ।

১৬ বছরে ৪ শতাধিক মৃত্যু
গত ১৬ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে পাহাড় ধসে।

২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখানবাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে চার পরিবারের ১২ জন, ২০০৯ থেকে ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় মারা যান ১৫ জন। ২০১১ সালের ১ জুলাই একই পরিবারের ৮ জনের মৃত্যু হয়। একই বছরে বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়।

২০১২ সালে ২৬-২৭ জুন নগরের ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৪ জন মারা যান। ২০১৩ সালে পাহাড় ধসে মৃত্যু হয় ২ জনের। ২০১৪ সালে ১ জন। ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে ৩ জন এবং ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় মা-মেয়ে মারা যান।

২০১৬ সালে নগরীতে কেউ মারা না গেলেও ওই বছরের ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া ও চন্দনাইশে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ১২-১৩ জুন রাঙামাটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫ জেলায় প্রাণ হারান ১৫৮ জন। এরমধ্যে চট্টগ্রামে ২৩ জন।
২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরের আকবরশাহ ফিরোজশাহ কলোনি এলাকায় মা-মেয়েসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।

ksrm