চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর তাণ্ডব—রোগীর মৃত্যু বেশি মা ও শিশু হাসপাতালে

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর তাণ্ডব থামছেই না। আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়ছে প্রতিদিন। ৩-৪ দিনের জ্বর থেকেই ডেঙ্গু রোগ জটিল হয়ে মারা যাচ্ছেন শিশু থেকে মধ্যবয়সীরা। আবার অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি করায়।

এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে আইসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এবং হাসপাতালে না আনলে অবহেলায় ডেঙ্গু ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কাপ্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।

জেলা সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৪ জন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) পরেই মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে মৃতের সংখ্যা বেশি। হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৮ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়াদের বেশিরভাগই শিশু।

জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে মোস্তাকিম (১০) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ২১ অক্টোবর রেসি মারা যান বিশ্বাসের (২৬)। ২৮ অক্টোবর ভোরে জাকারিয়া হোসেন তুষারের (২৪) মৃত্যু হয়। ১ নভেম্বর মারা যায় মো. মুন্না (১৭)। ৫ নভেম্বর বর্ণ চৌধুরী (১১) নামে এক শিশু মারা যায়। ৮ নভেম্বর আর্য দত্ত (৭) মারা যায়। ৯ নভেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জ্ঞানেন্দ্র নাথ মিত্র (৮৫) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর কাঞ্চন কুমার দে (৩৪) নামে একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়৷ এছাড়া মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে এখন প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গু অল্প কয়েকদিনের জ্বরেই জটিল রূপ নিচ্ছে। অনেক রোগীকে দেরিতে হাসপাতালে আনায় ডেঙ্গু জটিল আকার ধারণ করে মৃত্যু বাড়ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর মৃত্যু হচ্ছে আইসিইউতে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে, হাসপাতালে না আনলে অবহেলায় ডেঙ্গু ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।

Yakub Group

সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০৭ জন। সরকারি হাসপাতালে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮৩৮ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৫৬৯ জন। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, কিছুদিন আগেই আমাদের মেডিসিন বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৫০ জন ছাড়িয়েছিল। মেডিসিন ওয়ার্ডে (অ্যাডাল্ট) আজকে ইভিনিং রাউন্ডে দেখলাম ৩০-৩৫ জন রোগী এখনো আছেন।

তিনি বলেন, আমরা ডেঙ্গুকে তিন ভাগে ভাগ করি। গ্রুপ ‘এ’, ‘বি’ ও গ্রুপ ‘সি’। গ্রুপ ‘এ’-এর ক্ষেত্রে যদি সাধারণ জ্বর ও শরীর ব্যথা থাকে তাদের ঝুঁকি নেই। সেক্ষেত্রে আমরা রোগীদের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিই।

গ্রুপ ‘বি’ হচ্ছে যাদের জটিলতা আছে অর্থাৎ কারো প্লাটিলেট কমে গেছে, ব্লাড প্রেশার কমে গেছে, বেশি বমি হচ্ছে, দুর্বল লাগছে অথবা বয়স কম বা বয়স বেশি, এছাড়া প্রেগন্যান্সি আছে- সেক্ষেত্রে আমরা সেসব রোগীদের ওয়ার্ডে ভর্তি রাখছি।

গ্রুপ ‘সি’ হচ্ছে যেসব রোগী ডেঙ্গুর কারণে লিভার, ফুসফুস, ব্রেইন ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের হাসপাতালে এমন ২-৩ জন রোগী আছেন। তবে বেশিরভাগ রোগীই ‘বি’ ক্যাটাগরির। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ রোগীরই অণুচক্রিকা কমে যাচ্ছে, এটি ভয়ের। সেইসাথে কিছু রোগীর ব্লাড প্রেশার কম। সেক্ষেত্রে কোনো রোগীর স্পেশাল কেয়ার প্রয়োজন হলে আমরা আইসিইউতে চিকিৎসা দিচ্ছি।’

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর অধ্যাপক ডা. অনুপম বড়ুয়া আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না, আমাদের হাসপাতালে গড়ে ২০-২৫ জন করে ডেঙ্গু রোগী থাকছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের মেডিসিন বিভাগে মোট ৯০টি শয্যা আছে। বর্তমানে সবকটি শয্যায় এখন রোগী আছে। প্রতি ১০ জন রোগীর জন্য আমাদের একজন করে চিকিৎসক কাজ করছেন। এছাড়া আমাদের মেডিকেল অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রার, কনসালটেন্ট- সবাই চিকিৎসা কার্যক্রমে নিয়োজিত আছেন। আমাদের জনবলের সংকট নেই। সমস্যা হচ্ছে, কোনো কোনো রোগীকে আমরা আধুনিক সব চিকিৎসা দিলেও রোগীর উন্নতি হচ্ছে না৷ অর্থাৎ কারো দেখা যাচ্ছে রক্তক্ষরণ কমছে না, প্রেশার উঠছে না- এসব কারণে মৃত্যু হচ্ছে। তবে আমাদের চিকিৎসার কোনো গাফিলতি নেই।

রোগীর শরীরে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট (তরল ব্যবস্থাপনা) ঠিকমতো হতে হবে। তরল খাবার গ্রহণের বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক।

এসআই/আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।

ksrm