চট্টগ্রামে এবার সিগারেট ‘মজুদকাণ্ড’ অসাধু ব্যবসায়ীদের

চট্টগ্রামে ডিলার সিন্ডিকেটের মজুদকাণ্ডে জাতীয় বাজেটের আগেই বেড়েছে সিগারেটের দাম। পেঁয়াজ, সয়াবিন তেল, চালের পর এবার সিগারেট নিয়ে অবৈধ মজুদকাণ্ডে মেতেছে এসব মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা। সিগারেট কোম্পানিগুলোর সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভদের (এসআর) কাছ থেকে ডিলার বা পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে সিগারেট মজুদ করছে।

অসংখ্য খুচরা দোকানি এসআরদের কাছ থেকে সিগারেট নিতে না পেরে বাড়তি দামে অসাধু মজুদদারদের কাছ থেকে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কোম্পানি দাম না বাড়ালেও মজুদদার ডিলাররা বাড়িয়েছে সিগারেটের দাম।

চট্টগ্রামের চকবাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেট, হালিশহর, কালামিয়া বাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিন দেখা যায়, প্রতিবার জাতীয় বাজেটের ২/৩ দিন আগে সিগারেটের দাম বাড়ানো ডিলার সিন্ডিকেট চক্রটি এবার দাম বাড়িয়েছে বাজেটের প্রায় এক মাস আগেই। তবে একই এলাকার বিভিন্ন দোকানে একই সিগারেটের দুধরনের দাম দেখা গেছে। কোনো দোকানে আগের দামে, আবার কোনো দোকানে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সিগারেট।

প্রতি শলাকা ১৫ টাকা দামের বেনসন বিক্রি হচ্ছে ১৬ টাকা, গোল্ডলিফ কোথাও বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকা, আবার কোথাও বিক্রি হছে ১ টাকা বাড়িয়ে ১২ টাকা। একইভাবে স্টার, ডার্বি, মেরিসসহ প্রায় সব ধরনের বিড়ি-সিগারেটে আগের মূল্যের চেয়ে ১-২ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অনেক দোকানে সিগারেটের দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্য তর্কযুদ্ধ চলতে দেখা গেছে।

Yakub Group

আরও পড়ুন: বিস্ফোরণের ঝুঁকি—শক্তিশালী চক্রের কাছে ১০ হাজার অবৈধ গ্যাস সিলিন্ডার

দোকানির সঙ্গে তর্কে জড়ানো মো. ইউনুস আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, সকালে যে দোকান থেকে ১৫ টাকা করে বেনসন সিগারেট কিনেছি, সন্ধ্যার মধ্যে সে দোকানে কীভাবে সিগারেটের দাম বেড়ে ১৬ টাকা হয়ে যায়? দোকানির কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তর্কাতর্কির সৃষ্টি হয়। সিগারেট কোম্পানিগুলোও দাম বাড়িয়েছে বলে শুনিনি কোথাও। তাও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মগের মুল্লুকে আছি।

এই ক্রেতার সঙ্গে তর্কে জড়ানো খুচরা দোকানি মো. মামুন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, সিগারেট কোম্পানিগুলো সিগারেটের দাম বাড়ায়নি। কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে সিগারেট নিলে আগের দামেই নেওয়া যায়। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটররা এখন আমাদের মতো খুচরা দোকানগুলোতে আর আসছে না। এসআরদের থেকে সিগারেট নিতে পারলে ক্রেতাদের কাছে আগের দামেই বিক্রি করা যেত। কিন্তু এসআর না আসায় ডিলারদের কাছ থেকে বাড়তি দামে সিগারেট নিতে হচ্ছে। তাই আমাদেরকেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

কালামিয়া বাজার এলাকার আরেক খুচরা দোকানি রবিউল ইসলাম আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, সিগারেট কোম্পানিগুলো এখনও দাম বাড়ায়নি। তাও আমাদের বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরাতো সারাবছর কোম্পানিগুলোর এসআরদের (ডিস্ট্রিবিউটর) থেকে সিগারেট নিতাম। কিন্তু এখন এসআর আসছে না সিগারেট দিতে। মাঝে মাঝে আসলেও অনেক জোরাজুরি করে অল্পসল্প সিগারেট নিতে পারি, যা ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় খুবই কম। বাধ্য হয়ে পাইকারি দোকানি বা ডিলারদের থেকে সিগারেট নিতে গেলে বাড়তি দামে নিতে হচ্ছে। তাই আমাদেরকেও বাড়তি দামে ক্রেতাদের কাছে সিগারেট বিক্রি করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানির একজন সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআর) আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, কোম্পানি এখনও কোনো ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ায়নি। তবে জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানে মজুদের জন্য অতিরিক্ত পরিমাণে সিগারেট সরবরাহ করতে এসআরদের নানাভাবে প্রভাবিত করে। এসআরদেরকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে অতিরিক্ত সিগারেট নিয়ে নেয় তারা। কোম্পানির পক্ষ থেকে এসআরদের জন্য নির্দিষ্ট টার্গেট থাকে দোকানে সিগারেট সরবরাহ করার। তাই এসআররাও দ্রুত টার্গেট পূরণ ও বাড়তি টাকার লোভে ডিলার বা পাইকারি দোকানিদের কাছে অতিরিক্ত পরিমাণে সিগারেট সরবরাহ করে। ফলে খুচরা দোকানিরা আর কোম্পানির এসআরদের থেকে সিগারেট নিতে পারে না। তাদেরকে বাধ্য হয়ে ডিলার বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের থেকে নিতে হয়। এই সুযোগে ডিলাররা দাম বাড়িয়ে খুচরা দোকানিদের কাছে সিগারেট বিক্রি করে। তাই খুচরা দোকানিরা ক্রেতাদের কাছে বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রি করছে।

আরও পড়ুন: ‘আয়নাবাজি’ আড়ালে কিশোরী ধর্ষণ, যাবজ্জীবন জেলে কাটবে ভণ্ড পীরের

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় কোম্পানির টেরিটরি অফিসাররা ডিলারদের কাছ থেকে টাকা বা সুবিধা নিয়ে তাদের অতিরিক্ত পরিমাণে বিড়ি-সিগারেট সরবরাহের জন্য এসআরদের নির্দেশ দেন। ফলে অফিসারদের কথামতো এসব ডিলার বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের বেশি পরিমাণে সিগারেট দিতে বাধ্য হয় মাঠের ডিস্ট্রিবিউটররা। যার কারণে আমরা অন্যান্য খুচরা দোকানে চাহিদামতো সিগারেট দিতে পারি না। ডিলার ও সিগারেট কোম্পানির সেলস অফিসারদের এই অসাধু মজুদকাণ্ডের কারণে মূলত বাজারে সিগারেটের দাম বেড়েছে। অথচ কোম্পানি এখনো কোনো ধরনের সিগারেটের দাম বাড়ায়নি।

বিষয়টি জানতে চাওয়ার জন্য আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানির আগ্রাবাদ জোনের টেরিটরি সেলস অফিসার (টিএসও) শুভর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর এই প্রতিবেদককে তাঁর অফিসে চায়ের দাওয়াত দিয়ে বলেন, আপনারা সাংবাদিক মানুষ, মোবাইলেতো এসব বিষয়ে কথা বলা যাবে না। দয়া করে একটু আমার অফিসে আসেন, বসে আলাপ করা যাবে।

যোগাযোগ করা হলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক দিদার হোসেন আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ভোক্তাদের অধিকারবঞ্চিত করে যারা মজুদ বাণিজ্য করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা আমাদের কার্যক্রমে থাকে। তবে সত্যি বলতে সিগারেট বা তামাকপণ্য নিয়ে আমার কাজের অভিজ্ঞতা খুব একটা নেই, তাই এই বিষয়ে বেশি কিছু বলতে পারছি না। তবে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করবো।

আলোকিত চট্টগ্রাম

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

মন্তব্য নেওয়া বন্ধ।

ksrm