গৌরবের ৫৬ বছর—চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রঙের মেলা

আজ ১৮ নভেম্বর, গৌরবের ৫৬তম জন্মদিন পালন করতে যাচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রিতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি- এই চারটি বিভাগ নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। শুরুর সময় সাতজন শিক্ষক ও ২০০ শিক্ষার্থী ছিলেন আয়তনে সবচেয়ে বড় এই বিদ্যাপীঠের।

১৮ নভেম্বর দিনটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১৬ নভেম্বর) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার।

বৃহষ্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার থেকে আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কার্যক্রম। সকাল ১১টায় কেক কাটার পর সাড়ে ১১টায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন ড. মহীবুল আজিজ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চট্টগ্রামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় চট্টগ্রামের মানুষ স্থানীয়ভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুভব করে। ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় সম্মেলনে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ নির্মাণের কথা উপস্থাপন করেন। পরে ১৯৪২ সালে নূর আহমদ বঙ্গীয় আইন পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি পেশ করেন।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গেটে বেপরোয়া বাস পিষে মারল ২ জনকে

ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তানের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-১৯৬৫) প্রণয়নকালে চট্টগ্রামে একটি ‘বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরে ১৯৬২ সালের নির্বাচন প্রচারণায় ফজলুল কাদের চৌধুরী এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীকালে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হলে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

১৯৬৪ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের এক বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করা হয়। একই বছর ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।

বিভিন্ন আন্দোলনে চবি

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সহ দেশের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে চবির ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীবৃন্দ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, ১২ জন শিক্ষার্থী সহ তিন জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসেনকে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: তুরস্কের আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অর্জন চট্টগ্রামের ছেলের

Thai Food

চবি জাদুঘর

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ জাদুঘরে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান সহ বিখ্যাত সব শিল্পীদের শিল্পকর্ম যা সহজেই একজন শিল্প সচেতন ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। অষ্টম থেকে ১২শ শতাব্দীর কষ্টিপাথরের, কাঠের, কাদামাটির ও বিষ্ণু মূর্তি সহ প্রাচীন জীবাশ্মের সংগ্রহ রয়েছে এ জাদুঘরে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ‘প্রাণিবিদ্যা জাদুঘর’ ও সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ‘সমুদ্র সম্পদ জাদুঘর’ রয়েছে।

গ্রন্থাগার

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষাধিক বই ও ৪০ হাজার ইবুকের বিরাট এক সংগ্রহ। আছে বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসী, উর্দু ভাষায় লিখিত সুপ্রাচীন সব পাণ্ডুলিপি। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে লেখা বইয়ের সংগ্রহে রয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্নার।

স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্যসমূহ

চবিতে রয়েছে বেশকিছু স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্য। তন্মধ্যে, জয় বাংলা ভাস্কর্য, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, স্বাধীনতা স্মৃতি ম্যুরাল, স্মরণ স্মৃতিস্তম্ভ, মাস্টার দা সূর্যসেন স্মৃতিস্তম্ভ, বঙ্গবন্ধু চত্বর উল্লেখযোগ্য।

শাটল ট্রেন

১৯৮০ সালে চালু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে দুটি শাটল ট্রেন রয়েছে; যা বটতলি রেলওয়ে স্টেশন থেকে চবি রেলওয়ে স্টেশন এবং সেখান থেকে পুনরায় বটতলি রেলওয়ে স্টেশনে যাতায়াত করে। প্রতিটি ট্রেনেই ৯টি করে বগি যুক্ত রয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘সন’ পদক পেলেন বাংলাদেশি মেরিনা

জীববৈচিত্র্য

জীববৈচিত্র্যে অনন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে হরিণ, সজারু, বুনো শুকর সহ প্রায় ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, পাখি ও অস্তন্যপায়ী প্রাণীর বসবাস এই ক্যাম্পাসে। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষকদের গবেষণাপত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়ে আসছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ‌‌নজরুল ‘গবেষণা কেন্দ্র’ ও ‘জামাল নজরুল ইসলাম গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’ থেকে গবেষণাপত্র এবং চবির নিজস্ব গবেষণা পত্রিকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ, বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশিত পান্ডুলিপি, ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রকাশিত ইতিহাস পত্রিকা এবং অর্থনীতি বিভাগ থেকে ইকনমিক ইকো পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অগণিত শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

এসি
আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm