‘ক্ষোভে ফুঁসছে চট্টগ্রাম’ সিআরবির বুকে উঠছে কংক্রিটের উঁচু ভবন

সিআরবি— নগরের বুকে যেন একখণ্ড ‘সবুজ শহর’। যেখানে রয়েছে বহু শতবর্ষী গাছ। সবুজঘেরা ছায়া-শীতল এই স্থানটিকে খণ্ডিত করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে হাসপাতাল নির্মাণের।

এদিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তে উত্তাল চট্টগ্রাম। সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করে ইতোমধ্যে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রামের ১৭ বিশিষ্টজন। এমনকি এখানে হাসপাতাল চান না খোদ রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীরাও! হাসপাতালটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে স্মারকলিপিও দিয়েছেন রেলওয়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।

জানা যায়, নগরের সিআরবিতে রেল পূর্বাঞ্চলের কার্যালয়ের পাশে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় রেল কর্তৃপক্ষ। সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্ব চুক্তির আওতায় ২০২০ সালের ১৮ মার্চ এ প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে ইউনাইটেড চট্টগ্রাম হাসপাতাল লিমিটেড। বর্তমানে চলছে হাসপাতাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ।

এদিকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে সবুজঘেরা দৃষ্টিনন্দন সিআরবি এলাকায় শতবর্ষী গাছ কেটে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছেন নগরের বিশিষ্টজন, পরিবেশবিদ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

তাঁরা বলছেন, গাছকাটা নয়, বরং এই এলাকায় আরও বেশি করে গাছ লাগানো উচিত। হাসপাতাল হতে পারে নগরের অন্য কোনো স্থানে।

তবে রেলওয়ের দাবি, ছোটখাটো গাছ কাটা হলেও শতবর্ষী গাছগুলো রেখেই হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প পরিচালক আহসান জাবির গণমাধ্যমকে বলেন, শতবর্ষী গাছ রেখেই হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। সেভাবেই হাসপাতালের ডিজাইন করা হয়েছে।

অন্যদিকে সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের বিরোধিতা করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন নগরের ১৭ বিশিষ্টজন।

বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরের মাধ্যমে জানতে পারলাম চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি-সাত রাস্তার মোড় এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে বহুতল হাসপাতাল নির্মাণের চুক্তি সম্পাদন করেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। খবরটি চট্টগ্রামের আপামর মানুষকে অত্যন্ত ব্যথিত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করেছে। এর কারণ বহুবিধ।

হাসপাতালে স্বভাবতই অসুস্থ মানুষদের সমাগম ঘটবে, যা এলাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করবে এবং এতে সাধারণের স্বাস্থ্য, প্রাতঃ ও বৈকালিক ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। আমাদের দেশে একজন রোগীকে ঘিরে হাসপাতালে বহুজনের আগমন স্বাভাবিক ঘটনা। এতে এলাকার নির্জনতা তথা স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষুণ্ন হবে।

দেশে হাসপাতালের বর্জ্য নিষ্কাশন/ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত দক্ষতার অভাব রয়েছে। এখানেও তার পুনরাবৃত্তিরই আশঙ্কা রয়েছে। কেননা শত প্রতিশ্রুতি ও আইনি ব্যবস্থা সত্ত্বেও এমন নজিরই দেখা যায়। এতে পুরো এলাকা ও আশেপাশের অন্তত অর্ধশত খাদ্য বিপণি মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

বিশিষ্টজনরা বলেন, এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা দরকার। সিআরবি, সাত রাস্তার মোড় ও টাইগারপাস ঘিরে থাকা পাহাড় ও উপত্যকায় গাছপালামণ্ডিত যে এলাকাটি রয়েছে তা চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবেই গণ্য হয়। সমুদ্রবর্তী নদীবেষ্টিত এই পাহাড়ি নগর তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে যুগ যুগ ধরে দেশি-বিদেশি পর্যটক, ঐতিহাসিক, রাজনীতিক ও আগন্তুকদের মনযোগ ও প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে। এই আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র আলোচ্য নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপরূপ এলাকাটি।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই নয়, এটি ঐতিহাসিক কারণেও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ওই এলাকায় ১৯৩০ সনের ইতিহাস-প্রসিদ্ধ চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহীরা অর্থসংগ্রহের জন্যে অভিযান চালিয়েছিল, তদুপরি সিআরবি ভবনটি দেশের ব্রিটিশ বা কলোনিয়াল স্থাপত্যের বিলীয়মান নিদর্শনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি। এটি স্থাপত্যকলা ও ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষকের শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব বিবেচনা থেকেই এলাকাটিকে বাংলাদেশ সরকার সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ২৪ ধারা অনুযায়ী ঐতিহ্য ভবন ঘোষণা করে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে।

বিবৃতিতে তাঁরা আরও বলেন, এখানে বলা প্রয়োজন আমরা হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধী নই, কেবল একটি প্রাকৃতিক কারণে সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অনুচিত বলে মনে করছি। চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতালের প্রয়োজন আছে, তবে তা উপযুক্ত স্থানেই নির্মিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে অবকাঠামোগতভাবে দ্রুত বর্ধিষ্ণু এই নগরে রাজধানী ঢাকার মতো রমনা পার্ক নেই, নেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মতো সবুজঘেরা কোনো বড় অঞ্চল। নগরের মধ্যে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র এই একটি এলাকা।

‘তাই সবদিক বিবেচনা করে অবিলম্বে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ থেকে সংশ্লিষ্টদের সরে আসার অনুরোধ জানাব আমরা। অন্যথায় নাগরিক সমাজ আরও বৃহত্তর আন্দোলন ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হবে,’- যোগ করেন তাঁরা।

বিবৃতিদাতারা হলেন শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী, অধ্যাপক ড. অনুপম সেন, অধ্যাপক ড. সিকান্দার খান, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অধ্যাপক আবুল মনসুর, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, অধ্যাপক ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক হরিশংকর জলদাস, অধ্যাপক ফেরদৌস আরা আলীম, ডা. চন্দন দাশ, নাট্যব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার, অধ্যাপক অলক রায়, স্থপতি জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান।

এদিকে সিআরবিতে হাসপাতাল চান না খোদ রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীরা। ইতোমধ্যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন।

তাদের বক্তব্য— তারা হাসপাতালের বিপক্ষে নন। তবে এ ধরনের হাসপাতাল করার মতো চট্টগ্রাম নগরে রেলওয়ের অনেক জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু জমি প্রভাবশালীরা দখল করে আছেন। সেগুলো উদ্ধার করে হাসপাতাল করা যায়। সিআরবিকে কেন বেছে নেওয়া হলো তা তাদের বোধগম্য নয়।

যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) আহসান জাবীর বলেন, চুক্তি অনুযায়ী হাসপাতালের নকশা তৈরি করে কাছে জমা দিয়েছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। চউক নকশাটির অনুমোদন দিলে প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল নির্মিত হলে পরিবেশের কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে তা যাচাই করতে পরামর্শক নিয়োগ করেছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। এরপর পরিবেশ রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ করা হবে। তাছাড়া হাসপাতাল নির্মাণ করতে গিয়ে শতবর্ষী গাছগুলো যাতে কাটা না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।

সিআরবিতে হাসপাতাল হলে পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট হবে

পূর্ব রেলের সদর দপ্তর চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল হলে পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের গভর্নর আমিনুল হক বাবু।

পরিবেশ নষ্ট করে হাসপাতাল নির্মাণ না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শতবর্ষী বৃক্ষ, পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা ঘেরা সিআরবিতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রাণির আবাস রয়েছে। সিআরবির ছায়াঘেরা পরিবেশ নগরবাসীর প্রাতঃ ও বৈকালিক ভ্রমণ এবং বিনোদনের স্থান। এমন একটি জায়গায় হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, জনসমাগম বৃদ্ধি ও মেডিকেল বর্জ্যের কারণে সিআরবির বর্তমান পরিবেশ ও প্রকৃতি নষ্ট হবে।

মানবাধিকার নেতা আমিনুল হক বাবু আরও বলেন, গাছপালামণ্ডিত সিআরবি এলাকাটিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে গণ্য করা হয়। এর আগে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া সিআরবিতে রাস্তা সম্প্রসারণের নামে রেলওয়ের শতবর্ষী গাছ কাটা হয়েছে। এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আমরা জানতে পারিনি।

‘সিআরবির পরিবেশ ধ্বংসের ধারাবাহিকতায় এবার সেখানে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অপচেষ্টা চলছে। প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় একটি শতবর্ষী রেইনট্রি ছাড়াও কিছু বড় গাছ আছে। এছাড়া আছে পূর্ব রেলের সদর দপ্তর সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। আছে স্টাফ কোয়ার্টার। এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা অযৌক্তিক। হাসপাতাল করতে চাইলে সিআরবির বাইরে রেলের অনেক অব্যবহৃত জমি আছে, সেখানে করা যায়’-যোগ করেন তিনি।

ঐতিহাসিক সিআরবি ও শতবর্ষী বৃক্ষ রক্ষায় হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি আমিনুল হক বাবু।

জেডএইচ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm